ধোনি ছিলেন বলেই…

শত সমালোচনা সত্ত্বেও ধোনিহীন ২০১৯ বিশ্বকাপ হয়ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের জন্য চরম আনাড়িপনা আর অসহায়ত্বের প্রতিশব্দ হয়ে উঠত! ধোনি ছিলেন বলেই হয়ত ভারত টুর্নামেন্টজুড়ে মাথা উঁচু রেখে লড়াই করে যাওয়ার রসদ পেয়েছে!

২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ম্যানচেস্টারের আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে স্কোরবোর্ডে মাত্র পাঁচ রান উঠতেই ভারতের প্রথম সারির তিন ব্যাটার ফিরে গেছেন সাজঘরে! কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কোরকার্ড হয়ে গেল চার উইকেটে ২৪। গ্যালারিতে বসা কোটি ভারতীয় সমর্থকের চোখেমুখে তখন চরম হতাশার ছাঁপ। এমন সময়ে ড্রেসিংরুম থেকে ধীর পায়ে ক্রিজে এলেন এক শান্ত জাদুকর। হাফ সেঞ্চুরি করে দলের মান রক্ষা করলেন তিনি। তিনি আর কেউ নন, মাহেন্দ্র সিং ধোনি।

কিন্তু একটু ভাবুন তো, ২০১৯ সালের সেই বিশ্বকাপে যদি ধোনি না থাকতেন? কেমন হত টিম ইন্ডিয়ার ভাগ্য?

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ধোনিকে ছাড়া ২০১৯ বিশ্বকাপে ভারতের মিডল অর্ডার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারত। কারণ সেসময়ে দলে কোনো অভিজ্ঞ কাণ্ডারি ছিলেন না, যিনি কঠিন মুহূর্তে ম্যাচের হাল ধরতে পারতেন।

পাশাপাশি, ধোনি না খেললে ভারতকে উইকেটের পেছনে পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো তরুণ ঋষভ পান্থ কিংবা দিনেশ কার্তিকের ওপর। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসরে অভিজ্ঞ কেউ বাদে উইকেটের পেছনে চাপ সামলানো তরুণদের পক্ষে কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।

উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে ধোনি ম্যাচের যে নিয়ন্ত্রণ নিতেন, তা স্রেফ তাঁর ডিসমিসাল সংখ্যা দিয়ে বিচার করা বোকামি। ২০১৯ বিশ্বকাপে অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে নিখুঁত ফিল্ডিং সাজাতেও সাহায্য করেছেন তিনি। এমনকি স্পিনার কুলদীপ যাদব আর যুজবেন্দ্র চাহালকে প্রতি বলের আগে প্রতিপক্ষ ব্যাটারের দুর্বলতাগুলোও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তিনি।

এখানেই শেষ নয়! পিচ কেমন আচরণ করছে এবং কখন কোন ভ্যারিয়েশনের বল করা উচিত, তা পড়ার ক্ষেত্রেও ধোনির জুড়ি মেলা ভার। তাই বিশ্বকাপটিতে তিনি না থাকলে ম্যাচের মাঝের ওভারগুলোতে ভারতের তরুণ বোলিং আক্রমণ পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলত। বিরাট কোহলিও সংকটের সময়ে মাঠে পেতেন না তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতাকে।

২০১৯ বিশ্বকাপে ধোনির ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স আর পরিসংখ্যানের দিকেও ফ্ল্যাশব্যাক করা জরুরি। আসরটিতে তিনি আট ইনিংসে ৪৪.৬০ গড়ে মোট ২২৩ রান করেন। স্ট্রাইক রেট ছিল ৯৩। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি এবং লোকেশ রাহুলের পর তিনিই ছিলেন টুর্নামেন্টটিতে ভারতের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

গ্রুপ পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যানচেস্টারের কঠিন পিচে তাঁর অপরাজিত ৫৬ রানের ইনিংস ভারতকে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দেয়। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে টপ অর্ডার ব্যর্থ হওয়ার পর, তাঁর চাপের মুখে করা ৩৫ রান দলকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে। আফগানিস্তানের বিপক্ষেও তারকা ব্যাটারদের আসা-যাওয়ার মাঝে উইকেটের এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে জয় এনে দেন ধোনি। ২৮ বলে ৫২ রানের কার্যকর এক ক্যামিও ইনিংস উপহার দেন তিনি। কিন্তু, ধোনি না থাকলে হয়তো গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হতো দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

তবে মুদ্রার ওপিঠেও কিন্তু ছিল কিছু দৃশ্য। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ধোনির কচ্ছপ গতির ব্যাটিং তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। ক্রিকেট দুনিয়াজুড়ে তখন ধোনিকে নিয়ে তৈরি হয় তুমুল বিতর্ক। সমালোচকরা তোপ দাগেন, তাঁর অপরিণত ব্যাটিংয়েই ৩১ রানে থ্রি লায়ন্সদের কাছে পরাজিত হয় টিম ইন্ডিয়া!

এরপরও সব তর্ক-বিতর্ক যেন এক নিমেষে আড়ালে চলে যায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই সেমিফাইনালে। কিউইদের দেওয়া ২৪০ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে ভারত যখন মাত্র ২৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার উপক্রম, তখনই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ধোনি। রবীন্দ্র জাদেজার সাথে জুটি বেঁধে স্কোরবোর্ডে যোগ করেন ১১৬ রান। ধোনি খেলেন ৭২ বলে ৫০ রানের এক লড়াকু ইনিংস। কিন্তু ৪৯তম ওভারে এক নাটকীয় রান আউট ভারতের সব স্বপ্ন ও আশা ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।

২০১৯ বিশ্বকাপে ধোনির সাত নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামা নিয়েও বেশ আলোচনার জন্ম হয়! অথচ, গোটা আসরজুড়ে ভারতের ওপরের সারির ব্যাটারদের অফ ফর্মের ধারাবাহিকতার মাঝেও লোয়ার অর্ডারকে লড়াইয়ের প্রেরণা জুগিয়েছে মাহির ব্যাটই।

শত সমালোচনা সত্ত্বেও ধোনিহীন ২০১৯ বিশ্বকাপ হয়ত ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের জন্য চরম আনাড়িপনা আর অসহায়ত্বের প্রতিশব্দ হয়ে উঠত! ধোনি ছিলেন বলেই হয়ত ভারত টুর্নামেন্টজুড়ে মাথা উঁচু রেখে লড়াই করে যাওয়ার রসদ পেয়েছে! আর তাতেই ভারত সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মর্যাদা আর জৌলুসও ধরে রাখতে পেরেছে কিছুটা!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link