ফুটবল যদি হয় একটি ভাষা, তবে জিনেদিন জিদান ছিলেন তার সবচেয়ে মার্জিত কবি। আর যদি ফুটবল হয় যুদ্ধ, তবে তিনি ছিলেন এক বিষণ্ণ সেনাপতি। যার তরবারির এক টানে যেমন জন্ম নিত নিখুঁত শিল্প, তেমনি শেষ মুহূর্তে সেই তরবারি দিয়েই তিনি নিজের ভাগ্যে লিখে দিতেন ট্র্যাজেডি।
দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেই শহরের অপরাধপ্রবণ ও দরিদ্র শিল্পাঞ্চল ‘লা কাস্তেলান’। আলজেরীয় কাবাইল বংশোদ্ভূত অভিবাসী বাবা ইসমাইল ও মা মালেকার পঞ্চম সন্তান জিজুর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যে। যে কাদা-ধুলোর রাস্তায় জীবনের বেঁচে থাকাটাই ছিল প্রতিদিনের পরীক্ষা, সেখানে ফুটবল ছিল তাঁর একমাত্র ভাষা।
আঁবোঁ ও বরদোতে নিজের জাত চিনিয়ে জিদান প্রবেশ করেন ইউরোপীয় ফুটবলের মূল মঞ্চে। ১৯৯৬ সালে জুভেন্টাসে যোগ দিয়ে জেতেন টানা দুটি সিরি আ এবং বেলন ডি’অর (১৯৯৮)।

কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নান্দনিক স্থাপত্য তৈরি হয় ২০০১ সালে রেকর্ড ৬৪.৫ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার ফিতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর। ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে বায়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে বাঁ পায়ের সেই ঐতিহাসিক ভলি কেবল একটি গোল ছিল না। তা ছিল পদার্থবিদ্যার সূত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো ফুটবলের চিরন্তন অলংকার।
জিদানের ট্র্যাজেডি ও মহাকাব্য কখনোই একে অপরের থেকে আলাদা ছিল না। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে প্যারিসের ‘স্তাদ দ্য ফ্রান্সে’ ব্রাজিলের বিরুদ্ধে দুটি দর্শনীয় হেডে গোল করে তিনি ফ্রান্সকে এনে দেন প্রথম বিশ্বমুকুট। যে দেশে আলজেরীয় অভিবাসীদের সামাজিক অবস্থান ছিল প্রান্তিক, সেই দেশের জাতীয় প্রতীকে পরিণত হন এক অভিবাসীর সন্তান। ব্ল্যাক-ব্লাঙ্ক-বার রাজনৈতিক বিভাজন ভেঙে পুরো ফ্রান্স সেদিন এক সুর গেঁথেছিল জিজুর নামে।
কিন্তু সময় যাকে দেবতার আসনে বসায়, ভাগ্যের পরিহাসে তাকে মানবীয় ভুলের চরম মাশুলও দিতে হয়। ২০০৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক স্টেডিয়াম। ইতালির বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ, যা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ ৯০ মিনিট। ম্যাচের ৭ম মিনিটে পেনাল্টি থেকে পানেনকা শটে গোল করে যিনি শুরু করেছিলেন, সাধারণ সময়ের সমতা শেষে অতিরিক্ত সময়ের ১১০তম মিনিটে ঘটে সেই রূপকথার পতন।

ইতালীয় ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির কটূক্তির জবাবে জিদানের মাতেরাজ্জির বুকে মারাত্মক হেডবাট এবং লাল কার্ড দেখে মাঠত্যাগ – বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র ট্র্যাজিক ফ্রেম। সোনালী বিশ্বকাপ ট্রফিটির পাশ দিয়ে বিষণ্ণ ও নতশীরে জিজুর ড্রেসিংরুমে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটি প্রমাণ করে, পরম শ্রেষ্ঠত্ব আর চরম মানবীয় আবেগের সংমিশ্রণেই জিনেদিন জিদান।
মাঠের খেলাকে বিদায় জানিয়ে জিদান যখন ডাগআউটে দাঁড়ালেন, তখনও তাঁর ঝুলিতে লেখা হলো নতুন ইতিহাস। ২০১৬ থেকে ২০১৮ – টানা তিনবার রিয়াল মাদ্রিদকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোনাম এনে দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন কোচ জিদান। জিনেদিন জিদান সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি খেলোয়াড় হিসেবে জেতা বিশ্বকাপ ও ব্যালন ডি’অরের পাশে ম্যানেজার হিসেবে বসিয়েছেন অভাবনীয় সাফল্য। জিদান কোনো সাধারণ খেলোয়াড় বা কোচের নাম নয়। তিনি সবুজ মাঠের সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্টিক মহাকাব্য।











