সবুজ ঘাসের সম্রাট বেকেনবাওয়ার!

ফুটবলের দুনিয়ায় অনেকেই রাজা হন, কিন্তু সম্রাট বা ‘কায়জার’ একজনই। তিনি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

ফুটবলের দুনিয়ায় অনেকেই রাজা হন, কিন্তু সম্রাট বা ‘কাইজার’ একজনই। তিনি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ফুটবল কেবল কায়িক শ্রমের খেলা নয়। তাকানো, ভাবা এবং আভিজাত্যের সঙ্গে স্থান ও সময়ের জ্যামিতি বদলানোর এক শিল্পকথা, তা বিশ্বকে শেখানো প্রথম মানুষ তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মিউনিখের ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা। শ্রমিক পরিবারের সন্তান ফ্রাঞ্জ খুব অল্প বয়সেই বুঝিয়েছিলেন, তিনি ভিড়ের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসেননি। ১৯৫৮ সালে এক আঞ্চলিক ম্যাচে প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারের এক চড় খেয়ে সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন। যোগ দেননি সে সময়ের জনপ্রিয় ক্লাব টিএসভি মিউনিখে, বরং বেছে নিয়েছিলেন অপেক্ষাকৃত ছোট দল বায়ার্ন মিউনিখকে। সেই একটি জেদ বায়ার্ন এবং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস চিরতরে বদলে দেয়।

বেকেনবাওয়ার শুধু ফুটবল খেলেননি, নতুন এক পজিশনের জন্ম দিয়েছিলেন – ‘সুইপার’ বা ‘লিবেরো’। রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী হয়েও তিনি হঠাৎই ঝড়ের গতিতে বল নিয়ে উঠে যেতেন আক্রমণে। মাঠের মাঝখানে যখন তিনি বল পায়ে চলতেন, মনে হতো কোনো রাজপুত্র ধীর পায়ে নিজের সাম্রাজ্য পরিদর্শন করছেন।

১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে ম্যাচটি ফুটবলের ইতিহাসে ‘সেঞ্চুরি ম্যাচ’ নামে পরিচিত। সেই খেলায় প্রতিপক্ষের ফাউলে বেকেনবাওয়ারের ডান কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়। কিন্তু দলের সব সাবস্টিটিউশন শেষ হয়ে যাওয়ায় মাঠ ছাড়তে রাজি হননি তিনি। ডান হাতটি শরীরে পট্টি ও ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে খেলে গেছেন পুরো ১২০ মিনিট।

​সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। চার বছর পর, ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নিজের জন্মভূমি মিউনিখে অধিনায়ক হিসেবে জার্মানিকে এনে দেন কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ। ফাইনালে ইয়োহান ক্রুইফের গতিশীল ‘টোটাল ফুটবল’কে রুখে দিয়েছিল বেকেনবাওয়ারের সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব।

১৯৭৭ সালে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান বেকেনবাওয়ার। যোগ দেন নিউ ইয়র্ক কসমস ক্লাবে। সেখানে ফুটবলের আরেক মহীরুহ পেলে-র সঙ্গে একই দলে খেলেন তিনি। কেবল মার্কিন মুল্লুকে ফুটবলকে জনপ্রিয় করতেই নয়, মাঠের বাইরে তাদের দুজনের সখ্যতা ক্রীড়াবিশ্বে এক সুন্দর উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ডাগআউটে কোচ হিসেবে দাঁড়িয়ে আবারও বিশ্বজয়ের মুকুট পরান জার্মানিকে। ম্যারিও জাগালোর পর তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি খেলোয়াড় ও কোচ উভয় হিসেবেই বিশ্বকাপ জয়ের অসামান্য কীর্তি গড়েছেন।

​মাঠের রাজকীয় উপস্থিতি, দুইবার ব্যালন ডি’অর জয়, আর ক্লাব ফুটবলকে আধিপত্যের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া – সব মিলিয়ে বেকেনবাওয়ার ফুটবলকে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতা। জীবনপটে বার্ধক্য আর শারীরিক জটিলতার মেঘ নামলেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁর চিরবিদায়ের পর বিশ্ব ফুটবলের আকাশ আজও এক অনন্য আভিজাত্যের আলোয় আলোকিত থাকে। কাইজার চলে গেছেন, কিন্তু সবুজ ঘাসে ফেলে যাওয়া তাঁর পদচিহ্ন চিরকাল থেকে যাবে অমর কাব্য হয়ে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link