ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা ৩০ আগস্ট। সাল ২০১৭। মিরপুরের শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তখন সুনসান নীরবতা। মনের অন্দরে দোলাচল কোটি বাংলাদেশি ভক্তের। ঠিক তখনই তাইজুল ইসলামের বল আঘাত হানে অস্ট্রেলিয়ার শেষ ব্যাটার জশ হ্যাজেলউডের প্যাডে। আম্পায়ার তর্জনী তুলে আউটের ইঙ্গিত দিতেই মিরপুর ফেটে পড়ে উল্লাসে! এভাবেই পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবারের মতো হারিয়ে টেস্টে নিজেদের উত্থানের বার্তা দেয় বাংলাদেশ!
দৃশ্যতই, এটি স্রেফ কোনো সাধারণ জয় ছিল না। এটি ছিল বিশ্ব ক্রিকেটে লাল-সবুজের উত্থানের দৃপ্ত ঘোষণা। টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের প্রথম ১৬ বছরে বাংলাদেশ কেবল জিম্বাবুয়ে আর দ্বিতীয় সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাতে পেরেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর ১২ মাসেই পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয় টাইগাররা। ইংল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার পর ক্রিকেটের দীর্ঘ সংস্করণের শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের ঘরের মাঠে বধ করে নতুন রূপকথার জন্ম দেন তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানরা।
মূলত, বাংলাদেশ এই ল্যান্ডমার্কে পৌঁছায় দুই অভিজ্ঞ সেনানীর হাত ধরে। ৫০তম টেস্ট খেলতে নামা সাবেক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ও তারকা ব্যাটার তামিম ইকবালের অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্যেই ক্যাঙ্গারুদের পরাস্ত করার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ।

ম্যাচের প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশ ২৬০ রান করে। পাঁচ বাউন্ডারি ও তিনটি ওভার বাউন্ডারিতে গড়া তামিমের ৭১ রানের ঝকঝকে ইনিংসের সঙ্গে যোগ হয় ১১টি বাউন্ডারিতে সাজানো সাকিবের ৮৪ রানের এক ক্যামিও ইনিংস। জবাবে বল হাতে সাকিবের ঘূর্ণিতে মাত্র ২১৭ রানেই গুটিয়ে যায় অজিরা। ২৬ ওভার বল করে সাত ওভার মেইডেনসহ ৬৮ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট শিকার করেন এই বাঁহাতি স্পিনার।
দ্বিতীয় ইনিংসে আবারও হাফ সেঞ্চুরি হাঁকান ‘খান সাহেব’ বলে খ্যাত তামিম। ১৫৫ বলে আট চারের মারে ৭৮ রান করে তিনি সাজঘরে ফেরার পর মুশফিকুর রহিমের কার্যকর ৪১ রানের ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ অজিদের সামনে ২৬৫ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দেয়। চতুর্থ দিনে রান তাড়ায় নেমে ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভ স্মিথের ব্যাটিং কারিকুরিতে পরাজয়ের শঙ্কা জেগে ওঠে বাংলাদেশ সমর্থকদের মাঝে।
ঠিক সেসময়েই দলের কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন সাকিব আল হাসান। ১১২ রান করা ড্যাশিং ব্যাটার ওয়ার্নারকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে প্রথম প্রতিরোধ গড়েন তিনি। এর চার ওভার বাদে স্মিথকেও সাজঘরের পথ দেখিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে এনে দেন এই অলরাউন্ডার। অজিদের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামতে বেশিক্ষণ লাগেনি আর! মাত্র ৭৩ রানেই শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে ২০ রানের ব্যবধানে পরাজিত হয় অস্ট্রেলিয়া।

দ্বিতীয় ইনিংসেও সাকিব ৮৫ রান দিয়ে ‘ফাইফার’ পান। গড়েন আরেক অনন্য কীর্তিও। টেস্ট ইতিহাসে রিচার্ড হ্যাডলির পর তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় বনে যান, যিনি একের বেশি টেস্টে হাফ-সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন।
টেস্ট ক্রিকেট যে কতটা জীবন্ত ও রোমাঞ্চকর হতে পারে, তা মিরপুরে বাংলাদেশের অজি বধের এই ম্যাচ বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়। একইসঙ্গে, এটি স্পষ্ট করে তোলে ক্রিকেটের আধুনিক যুগে শক্তিমান কিংবা দুর্বল দল বলে কিছু নেই — যে কেউই, যে কারোর বিপক্ষে পেতে পারে জয়, লিখতে পারে নতুন গল্প, গড়তে পারে নতুন ইতিহাস!










