প্রতিটা মহান ব্যাটসম্যানের গায়েই কোথাও না কোথাও একটা সুপ্ত দুর্বলতা লুকিয়ে থাকে, শুধু সময়ের অপেক্ষা—কবে প্রতিপক্ষের চোখ সেই ফাটল খুঁজে বের করবে।বছরের পর বছর যেটা আড়ালে থাকে, তারপর হঠাৎ একদিন কেউ একজন সেই জায়গাটা খুঁজে পায়, আর তখনই শুরু হয় পতনের গল্প।
জো রুটের বেলাতেও এবার সেই জায়গাটা খুঁজে পাওয়া গেছে। আর তার প্রমাণ মিলছে বারবার, একই ছবিতে—সামনের পা এগিয়ে যাচ্ছে, প্যাডে লাগছে বল, আর আম্পায়ারের আঙুল উঠে যাচ্ছে ওপরে। শেষ আট ইনিংসে ছয়বার এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরেছেন রুট—সংখ্যাটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও আসল ভয়টা লুকিয়ে তুলনায়।
কারণ এর ঠিক আগের প্রায় দুই বছরে, অর্থাৎ ১০৫ ইনিংস জুড়ে, তিনি এভাবে আউট হয়েছেন মোটে ছয়বার। যেই ঘটনা ঘটতে সময় লেগেছিল দুই বছর, সেটাই এখন ঘটছে আট ইনিংসের মধ্যে—অর্থাৎ প্রতি দুই ইনিংসে একবার করে। একবার এলবিডব্লিউ হলে সেটা দুর্ঘটনা বলা যেত, দুবার হলে নেহাত কাকতাল। কিন্তু এই আকস্মিক পরিবর্তনটাই বলে দেয়, ব্যাপারটা আর কাকতালীয় নেই—প্রতিপক্ষের ড্রেসিংরুমে বসে আঁকা একটা নীল নকশা এখন কাজ করছে নিখুঁতভাবে।

দুর্বলতাটা আসলে রুটের চেনা পুরনো ব্যথা। নিপ-ব্যাকারে তার ব্যাট আসে অদ্ভুত এক কোণে, আর তাতেই সামনের প্যাড খুলে যায় বিপদের মুখে। আগে বুমরাহ বা কামিন্স মাঝেমধ্যে সে সুযোগ নিতেন, কিন্তু তা ছিল কালেভদ্রের ঘটনা।
এবারের ইংলিশ গ্রীষ্মে সেই বিরলতাই বদলে গেছে নিয়মে। উইকেটকিপার স্টাম্পের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ায় রুট আর ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারছেন না—শর্ট কিপিংয়ের এই কৌশলে তাকে বেঁধে ফেলেছেন ম্যাট হেনরি আর নাথান স্মিথ, এই গ্রীষ্মের পাঁচ আউটের চারটিই যাদের হাতে। একই অস্ত্র এখন হাতে তুলে নিতে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের বোলারদেরও।
অথচ রুট এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে। শচীনের ১৫,৯২১ রানের রেকর্ড থেকে তিনি দূরে আছেন মোটে আড়াই হাজার রানের মতো, বয়স ৩৫ পেরিয়েও ফর্ম অটুট। কিন্তু ক্যারিয়ারের এই শেষ অধ্যায়ে এসে এমন একটা ফাটল বেরিয়ে আসা সাধারণত সতর্কঘণ্টা বাজায়। বিরাট কোহলির উদাহরণটা এখানে প্রাসঙ্গিক।

অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা মারার রোগ তাকেও তাড়া করেছিল একই কায়দায়—শেষ বোর্ডার-গাভাস্কার সিরিজে আটটি ইনিংসের আটটিতেই কট বিহাইন্ড, গড় নেমে এসেছিল তেইশে। সেই একটামাত্র দুর্বলতাই সর্বকালের অন্যতম সেরার তকমা কেড়ে নিয়ে কোহলিকে নামিয়ে দিয়েছে ‘শুধুই ভালো’ ব্যাটসম্যানের কাতারে।
তাহলে রুটের সামনে এখন দুটো পথ খোলা। এক, স্টিভ স্মিথের মতো নিজের টেকনিকে অদ্ভুত অথচ কার্যকর কোনো বদল এনে এই ফাঁদ ভেঙে বেরিয়ে আসা। দুই, কোহলির মতো এই দুর্বলতা সঙ্গে নিয়েই খেলে যাওয়া, আর প্রতিটা সিরিজে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার প্রথম পাতায় নাম লিখিয়ে রাখা। শচীনের রেকর্ড স্পর্শ করার আগে রুট কি পারবেন নিজের সামনের পা-টাকে এই ফাঁদ থেকে বাঁচাতে?











