প্রিয় ক্লাবের প্রতি আবেগ কি সমাপ্তিলগ্নে?

আধুনিক ফুটবলের দিকে তাকালে অস্বীকার করার উপায় নেই, আজকের দর্শক আর কোনো ক্লাবের লোগো বা ব্যাজের প্রেমে অন্ধ নয়, তারা অন্ধ নির্দিষ্ট কোনো তারকার প্রেমে।

একটা সময় ছিল, প্রিয় ফুটবল ক্লাব মানে ছিল নিজের সত্তা কিংবা পরিচয়েরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ যদি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থক হতেন, তবে তাঁর চারপাশের জীবনটাও গড়ে উঠত সেই ওল্ড ট্রাফোর্ডের লাল রঙকে কেন্দ্র করে। কিন্তু খেলার সেই পুরনো আবেগে আজ নতুন হাওয়া বইছে।

আধুনিক ফুটবলের দিকে তাকালে অস্বীকার করার উপায় নেই, আজকের দর্শক আর কোনো ক্লাবের লোগো বা ব্যাজের প্রেমে অন্ধ নয়, তারা অন্ধ নির্দিষ্ট কোনো তারকার প্রেমে। ইন্টার মিয়ামিতে লিওনেল মেসির আগমনে ফ্ল্যামিঙ্গো গোলাপি জার্সির যে জোয়ার উঠেছিল, তার সাথে মিয়ামি শহরের সমর্থনের দূরতম সম্পর্কও ছিল না।

ঠিক তেমনি রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা ছেড়ে রোনালদো ও মেসি যখন সৌদি প্রো লিগ কিংবা এমএলএসে পাড়ি জমালেন, তখন বৈশ্বিক ভক্তকুলও ক্লাবের সীমানা পেরিয়ে তারকাদের পেছনে পেছনে স্থানান্তরিত হলো। ফুটবল সমর্থনের এই আমূল পরিবর্তনের মূল কলকাঠি নাড়ছে ভিডিও গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া ও তারকাদের পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং।

একসময় মানচিত্র বা পারিবারিক সূত্রে মানুষের ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা জন্মাত। কিন্তু ইএ স্পোর্টস কিংবা ই-ফুটবলের মতো গেমিং জগতে বেড়ে ওঠা তরুণদের জানাশোনা নিখুঁত ও বিশ্বজনীন। স্ক্রিনে নিজেদের দলে পছন্দের খেলোয়াড়কে দিয়ে গোল বানানোর অভ্যাস বাস্তব জীবনের আনুগত্যকেও শিথিল করে দিয়েছে।

গবেষণাও বলছে, বিশ্বের প্রায় সিংহভাগ ফুটবল সমর্থক এখন মূল দলের পাশাপাশি একটি দ্বিতীয় দল পছন্দ করে। কিন্তু সেই পছন্দের স্থায়ীত্ব খুব কম। প্রিয় খেলোয়াড় ক্লাব বদলালেই এই ‘সেকেন্ড-ক্লাব’ প্রেম এক নিমেষে অন্য ঠিকানায় হাতবদল হয়ে যায়।

আগে ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের মিডিয়া ও ক্যারিয়ার নিয়ন্ত্রণ করলেও, এখন চিত্রনাট্যের সম্পূর্ণ দখল তারকাদের হাতে। ২০১৮ সালে গ্রিজমানের নিজের দলবদলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আধা ঘণ্টার টিভি শো করার ঘটনা দিয়ে যে ধারার সূচনা হয়েছিল, আজ তা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত।

আর্লিং হাল্যান্ড, জুড বেলিংহাম কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ভক্তদের সাথে যুক্ত হন। ভক্তরাও ক্লাবের তৈরি কৃত্রিম ভিডিওর চেয়ে তারকার সরাসরি জীবনধারা, ব্যক্তিগত ভ্লগ বা করোনা মহামারীতে মার্কাস রাশফোর্ডের মতো সামাজিক নীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার কাজগুলো থেকেই বেশি অনুপ্রেরণা পায়।

বিশ্বকাপের মতো বড় আসরগুলো এখন কেবল দেশের লড়াই নয়, বরং পার্সোনাল ব্র্যান্ড উন্মোচনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। যেমন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী মুহূর্তেই কয়েক মিলিয়নে রূপ নেয়।

এই নতুন ঢেউ ফুটবল ক্লাবগুলোকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। তারকা আসার পর কোটি কোটি ডলারের জার্সি বিক্রি ও প্রচার হলেও, খেলোয়াড় ক্লাব ছাড়ামাত্র সেই ভক্তদের একটি বড় অংশই হাওয়া হয়ে যায়।

অথচ শত বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লাবগুলো একসময় ছিল আবেগ ও সমর্থনের একমাত্র ঠিকানা। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষ আর কেবল নির্জীব কোনো লোগো বা ব্যাজকে ভালোবাসে না, তারা ভালোবাসে রক্ত-মাংসের মানুষ ও তাদের জীবন্ত গল্পকে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link