স্বকীয় মালিঙ্গা যখন সেরাদের সেরা!

মালিঙ্গার সব অর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ক্রিকেটে বা জীবনে স্বকীয় হয়ে ওঠা কতটা জরুরি। এটাই হয়ত সেরাদের সেরা হওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ!

ম্যাচের শেষ পর্যায়। গ্যালারিতে তখন উন্মাদনার ঢেউ। রানআপ নিয়ে এসে স্লিংগি অ্যাকশনে ইয়র্কার লেন্থে বল ছুঁড়ে দিলেন এক বোলার। নিমেষেই ব্যাটারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বলটা উড়িয়ে দিল স্টাম্প! বলুন তো কে এই দৃশ্যের নায়ক? হ্যাঁ, তিনিই ক্রিকেট বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটারদের ত্রাস, লাসিথ মালিঙ্গা। আধুনিক সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ডেথ ওভারের বোলিংকেই তিনি নিয়ে গেছেন স্বকীয় অবস্থানে। প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি গড়েছেন নিজস্ব বোলিং অ্যাকশনের প্রতাপশালী সাম্রাজ্য!

মালিঙ্গার গল্পের শুরুটা কোনো বিলাসবহুল ক্রিকেট একাডেমিতে হয়নি। লঙ্কান দ্বীপের প্রখ্যাত শহর গলের অদূরে রথগামার সমুদ্রবিধৌত প্রাঙ্গণে ক্রিকেটে হাতেখড়ি হয় এই ডানহাতি পেসারের। কোচ চম্পাকা রামানায়েকেসহ অন্যদের নির্দেশনায় তিনি ধীরে ধীরে শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলে উঠে আসেন।

২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় এই বিধ্বংসী বোলারের। প্রথম টেস্ট ম্যাচেই ৯২ রানে ৬ উইকেট শিকার করে তিনি জানান দেন নিজের আগমনী বার্তার। পরের বছর নিউজিল্যান্ড সফরে আরও রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন মালিঙ্গা। তাঁর নিচু ও ভয়ানক ডেলিভারি চোখে ধরা না পড়ায় বাধ্য হয়ে কিউই ব্যাটাররা আম্পায়ারকে তাদের ট্রাউজারের রঙ বদলে দিতে অনুরোধ করেন। কারণ মালিঙ্গার মাস্টারক্লাস লো-স্লিং অ্যাকশনের কারণে বল দেখাই তুমুল চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্রেন্ডন ম্যাককালামদের জন্য। এ যেন এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ!

গতির সাথে নিখুঁত ইন-সুইং আর মারাত্মক ধীরগতির ইয়র্কার ছিল মালিঙ্গার শক্তির মূল স্তম্ভ। ব্যাটাররা জানতেন কী ধরনের বল আসছে, তবুও তারা তা রুখতে পারতেন না। শ্রীলঙ্কার হয়ে টেস্টে মাত্র তৃতীয় বোলার হিসেবে ১০০ উইকেট শিকারের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। তবে সাদা বলের ক্রিকেটই ছিল মালিঙ্গার আসল ঠিকানা। সেখানে তাঁর অনন্য অ্যাকশন এবং অসাধারণ ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয় দারুণভাবে। ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোতে শ্রীলঙ্কার দুর্দান্ত সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এই কিংবদন্তি পেসার।

২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে এক অতিমানবীয় গল্প লেখেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র বোলার হিসেবে তিনি টানা চার বলে চার উইকেট শিকার করে ম্যাচটা শ্রীলঙ্কার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন, অবশ্য শেষ পর্যন্ত প্রোটিয়ারাই জয়ী হয়। এরপর কেনিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেও তিনি হ্যাটট্রিক করে নিজের বোলিং নৈপুণ্যকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। তিনিই বিশ্ব ক্রিকেটের একমাত্র বোলার, যাঁর ঝুলিতে রয়েছে দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট পাঁচটি হ্যাটট্রিক নিয়ে মালিঙ্গা ক্রিকেট বোদ্ধাদের কাছে হ্যাটট্রিক সম্রাট হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন!

তবে এই অনবদ্য যাত্রার পথ সবসময় মসৃণ ছিল না লাসিথ মালিঙ্গার জন্য। হাঁটু ও গোড়ালির দীর্ঘস্থায়ী চোট তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ভাগে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নিজের ক্যারিয়ারকে দীর্ঘায়িত করার জন্য ২০১১ সালে তিনি টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। এই সাহসী সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। কিন্তু মালিঙ্গা তাঁর লক্ষ্য থেকে এক চুলও নড়েননি। তিনি নিজের বোলিংয়ের কার্যকারিতা বাঁচিয়ে রাখেন রঙিন পোশাকের ক্রিকেটের জন্য।

তিনি যে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেননি, তাঁর প্রমাণ মেলে দ্রুতই। ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর অনবদ্য নেতৃত্ব ও দুর্দান্ত বোলিংয়ের তোড়ে শ্রীলঙ্কা প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়। ফাইনালে ভারতকে পরাস্ত করে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন অধিনায়ক মালিঙ্গা। ম্যাচের ডেথ ওভারে মালিঙ্গা তাঁর দুর্দান্ত সব ইয়র্কারের কারিকুরি দেখান। আর তাতেই ভারতের তারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি ও মাহেন্দ্র সিং ধোনি রান তুলতে ব্যর্থ হন, ১৩০ রানে থামে ম্যান ইন ব্লুজদের ইনিংস। জবাবে কুমার সাঙ্গাকারা আর মাহেলা জয়াবর্ধনের নির্লিপ্ত ব্যাটিংয়ে হেসেখেলে ম্যাচ জিতে নেয় লঙ্কানরা।

জাতীয় দলের বাইরে বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও মালিঙ্গা ছিলেন এক পরাক্রমশালী নাম। আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে নয় মৌসুমে ১৭০ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টটির সর্বকালের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির মুকুট নিজের করে নেন তিনি।

বয়স বাড়লেও তাঁর ক্রিকেটীয় বুদ্ধির ধার এতটুকু কমেনি। তাঁর অভিজ্ঞ বোলিং ভেলকিতে ২০১৯ সালের আইপিএল ফাইনাল ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ হিসেবে আখ্যা পায়। শেষ বলে মুম্বাইয়ের দরকার ছিল মাত্র দুটি রান রক্ষা করা। ঠিক সেসময়ে চরম উত্তেজনা আর চাপের মুখে মালিঙ্গা ছুঁড়ে দেন এক নিখুঁত স্লোয়ার ইয়র্কার। আর তাতেই প্রতিপক্ষ ব্যাটার বলকে ছুঁতে ব্যর্থ হন ব্যাট দিয়ে। ফলাফল? মুম্বাইয়ের এক রানের শ্বাসরুদ্ধকর জয়!

একই বছর নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তিনি আবারও চার বলে চার উইকেট নেওয়ার অনবদ্য নজির গড়েন। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সময় মালিঙ্গা ছিলেন শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ টি-টোয়েন্টি উইকেট শিকারি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব ফরম্যাট মিলিয়ে ৫৪৬টি উইকেটের মালিক ১৯৮৩ সালের ২৮ আগস্ট জন্মানো এই পেসার। এর মধ্যে ওয়ানডেতে তিনি ২২৬ ম্যাচে শিকার করেছেন ৩৩৮টি উইকেট।

মাঠের লড়াই শেষ হলেও ক্রিকেটের সাথে তাঁর বন্ধন ছিঁড়েনি এখনও। ২০২৪ সালে তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বোলিং কোচ হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করেন। মালিঙ্গার সব অর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ক্রিকেটে বা জীবনে স্বকীয় হয়ে ওঠা কতটা জরুরি। এটাই হয়ত সেরাদের সেরা হওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

গোল-আকালের অবসান ঘটাবেন রোনান!

বয়সভিত্তিক ফুটবলে রোনান সুলিভান অবশ্য নিজের সামর্থ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৬ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের পথে পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারেও গোল করেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। কৌশলগতভাবে রোনানকে কার্যকর করে তুলতে প্রয়োজন উইং থেকে নির্ভুল ক্রস, মাঝমাঠ থেকে থ্রু পাস এবং আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে দ্রুত বল সরবরাহ। প্রতিপক্ষ নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজালে বক্সে তাঁর পজিশনিং ও ফিনিশিং গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের প্রেসিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্রুত পাসিং, বলের দখল ধরে রাখা এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে কার্যকর উত্তরণ।

আফগান ঘূর্ণির মায়াজালে ধরাশায়ী হবে মিরাজ-রাজারা?

তবে স্পিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্পিনাররা শিকার করেছেন মোট ৮২টি উইকেট। যদিও চলতি বছরে ১২ ম্যাচে স্পিন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২৬ উইকেট, ২০২৫ সালে ১১ ম্যাচে রিশাদ, মিরাজ, তানভীর, নাসুমদের শিকার ছিল ৫৬ উইকেট। গত বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচেই স্পিন সহায়ক উইকেট থাকলেও চলতি বছরে দলটি খেলেছে তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে। ফলে কন্ডিশনের সহায়তা পেলে বাংলাদেশের স্পিনাররাও যে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে সক্ষম, তার ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই। রিশাদ হোসেনের আক্রমণাত্মক লেগ স্পিন, মেহেদী হাসান মিরাজের নিয়ন্ত্রিত অফ স্পিন, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে নতুন সংযোজন রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম। বৈচিত্র্য আর কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে মরণকামড় দিতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশও।

Share via
Copy link