আকাশ কাঁদছিল টানা তিনটে দিন। সেঞ্চুরিয়নের সবুজ মাঠ তখন যেন একটা ভেজা ক্যানভাস, যার ওপর কোনো গল্প আঁকা হচ্ছিল না। প্রথম দিন দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাট করে থেমেছিল অল্প রানে, ছয় উইকেট হারিয়ে— তারপর প্রকৃতি যেন সিদ্ধান্ত নিল, এই টেস্টে আর বল গড়াবে না। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ দিন— একটানা তিনদিন একটাও বল মাঠে পড়েনি। সিরিজ তখন দক্ষিণ আফ্রিকার হাতে, ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, শেষ টেস্টটা প্রায় নিয়তির হাতে ড্র হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।
কিন্তু পঞ্চম দিন সকালে যা ঘটল, তা ক্রিকেট ইতিহাসের অদ্ভুততম এক অধ্যায়। হ্যান্সি ক্রনিয়ে আর নাসের হুসেইন— দুই অধিনায়ক মাথা ঘামালেন এক দুঃসাহসী ফর্মুলায়। দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস ঘোষণা করল ২৪৮ রানে। ইংল্যান্ড নিজেদের প্রথম ইনিংস ছেড়ে দিল শূন্য রানেই। দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ইনিংসও ঘোষণা করল শূন্যে। ফলাফল— ইংল্যান্ডের সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল মাত্র ২৪৯ রান, একটামাত্র দিনে। যেন কেউ দাবার বোর্ড উল্টে দিয়ে বলল, এবার নতুন করে খেলা শুরু হোক।
আর সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখাল ইংল্যান্ড। মাইকেল ভন আর অ্যালেক স্টুয়ার্টের ব্যাটে ভর করে ইংল্যান্ড লক্ষ্যে পৌঁছাল ২৫১/৮ রানে, মাত্র ২ উইকেটের ব্যবধানে জয়। ভন হলেন ম্যাচসেরা। সেদিনের গ্যালারি উত্তেজনায় কাঁপছিল— মনে হচ্ছিল, ক্রিকেট তার সবচেয়ে মহান স্পোর্টসম্যানশিপের গল্প লিখল।

কিন্তু সেই গল্পের নিচে লুকিয়ে ছিল অন্য এক সত্যি, যা প্রকাশ পেল মাস কয়েক পরে। ২০০০ সালের এপ্রিলে হ্যান্সি ক্রনিয়ে নিজেই স্বীকার করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন এক বুকমেকার মার্লন অ্যারনস্ট্যাম তাঁকে ম্যাচের শেষ দিনে ফোন করেছিলেন। প্রস্তাব ছিল— একটা ফলাফল বের করে আনতে হবে, ড্র চলবে না। বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি ছিল পাঁচ লাখ র্যান্ড, যাবে ক্রনিয়ের পছন্দের দাতব্য প্রতিষ্ঠানে, সঙ্গে ব্যক্তিগত উপহার। ম্যাচের পর অ্যারনস্ট্যাম হাজির হন হাতে নগদ টাকা আর একটা চামড়ার জ্যাকেট নিয়ে— সেই জ্যাকেটই পরে হয়ে ওঠে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে কুখ্যাত উপহার। কিং কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে পুরো চক্রান্তের ছবি, আর ক্রনিয়ের ক্যারিয়ার শেষ হয় আজীবন নিষেধাজ্ঞায়। ইংলিশ ওপেনার মার্ক বাউচার পরে বলেছিলেন, পুরো ব্যাপারটাই ছিল ভুয়ো, বানানো এক নাটক। নাসের হুসেইনও পরে স্বীকার করেন, তিনি বুঝতে পারেননি ক্রনিয়ে আসলে কী করছিলেন।
আজও এই টেস্টকে ডাকা হয় “লেদার জ্যাকেট টেস্ট” নামে— একটা ম্যাচ, যেখানে দুই দল কার্যত একটাও রান না করেই ইনিংস ঘোষণা করেছিল, শুধু বৃষ্টি নয়, বরং টাকার হিসেবেও।
আধুনিক ক্রিকেটে প্রযুক্তি আর কড়া নজরদারির যুগে কি এমন কিছু আর কখনো ঘটতে পারবে?












