গীত শেষে বীণা পড়ে রয় ধূলি মাঝে!

কাজী নজরুল এক গানে লিখেছিলেন: “চাঁদেরে কে চায়, সবাই জ্যোৎস্না যাচে/ গীত শেষে বীণা পড়ে রয় ধূলি মাঝে!” এমন চিত্র যেন নব্বইয়ের দশকের অন্যতম সেরা পাকিস্তানি ওপেনার সাঈদ আনোয়ারের ক্যারিয়ারকে মনে করিয়ে দেয়!

সবসময় জাদুকরী টাইমিং আর নিখুঁত প্লেসমেন্টের কারিকুরিতে ক্রিজে মুগ্ধতা ছড়াতেন নিয়মিত। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে ছিলেন চূড়ান্ত ব্যাটিং সেনসেশন। অথচ সাঈদ আনোয়ার আজীবন আন্ডাররেটেড খেলোয়াড়দের তালিকাতেই রয়ে গেছেন। যদিও, বেশকিছু পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধায় তিনি শচীন টেন্ডুলকার কিংবা সনাথ জয়াসুরিয়াদের মতো তারকা ব্যাটারদেরও ছাপিয়ে উঠেছিলেন!

সাঈদ আনোয়ারের ক্রিকেটীয় মহাকাব্যের সূচনার পেছনে এক অদ্ভূত গল্প আছে। ১৯৭৭ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সময় সাঈদ আনোয়ারের বাবা তেহরানে কর্মরত ছিলেন, সাঈদও ছিলেন সেখানে। কিন্তু, বিপ্লবের পর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ডামাডোলে পড়ে নয় বছরের ছোট্ট আনোয়ারকে করাচিতে দাদা-দাদীর কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি। ক্রিকেট সম্পর্কে জ্ঞান না রাখা আনোয়ার এরপর ক্রমেই ক্রিকেটের সংস্পর্শে আসেন।

মূলত, বাবার পথ ধরে ক্রিকেটে আগমন তাঁর। আনোয়ারের বাবা মোহাম্মদ আনোয়ার ছিলেন একজন প্রতিভাবান ক্লাব ক্রিকেটার। বড় বড় শট খেলায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। করাচিতে একবার তিনি এমন এক জোরালো শট খেলেছিলেন যে বল দুটি খেলার মাঠ পার হয়ে গিয়েছিল!

সেই করাচিরই এক সংকীর্ণ গ্যারেজে শুরু হয় তাঁর ছেলে সাঈদ আনোয়ারের ব্যাটার হয়ে ওঠার প্রস্তুতি। তবে, তিনি বলের প্রতি চিতাবাঘের মতো প্রতিক্রিয়া জানানোর অনবদ্য দক্ষতা গড়ে তোলার প্রেরণা পান কিংবদন্তি স্কোয়াশ খেলোয়াড় জাহাঙ্গীর ও জানশের খানের খেলা দেখে। গ্যারেজে মাত্র ১৪ গজ দূর থেকে তাঁর বন্ধু রশিদ লতিফের দ্রুতগতির টেপ-টেনিস বলের মুখোমুখি হতেন আনোয়ার। এই কঠিন অনুশীলনই পরবর্তীতে বিশ্বের দ্রুততম বোলারদের মোকাবেলা করার আত্মবিশ্বাস জোগায় তাঁকে। রশিদ লতিফও পরে সতীর্থ হন তাঁর।

বিস্ময়করভাবে, ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে মালির জিমখানার হয়ে নয় নম্বর ব্যাটসম্যান ও বাঁ-হাতি স্পিনার হিসেবে খেলতে শুরু করেন সাঈদ! কিন্তু অসামান্য প্রতিভার জোরে দ্রুতই ব্যাটিং অর্ডারের ওপরে উঠে আসেন তিনি।

১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে নর্থওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারের হয়ে ১২৭ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে প্রথম নজর কাড়েন এই বাঁহাতি ব্যাটার। এরপর পাকিস্তানের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট উইলস কাপের ফাইনালে প্রতিপক্ষ পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল অ্যায়ারলাইন্সের কিংবদন্তি বোলার ওয়াসিম আকরামের বলে টানা দুটি ছক্কা আর দুটি চার হাঁকিয়ে দেশটির ক্রিকেট মহলে হইচই ফেলে দেন তিনি।

এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেক হয় সাঈদ আনোয়ারের। কিন্তু শুরুটা রাঙাতে পারেননি তিনি। ম্যালকম মার্শালের বলে মাত্র ৩ রানে আউট হন আনোয়ার।

তাঁর টেস্টে অভিষেকের গল্পটাও চরম বিপর্যয়ের হয়ে ওঠে! ফয়সালাবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ইনিংসেই শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন তিনি। ফলে অধিনায়ক ইমরান খান আনোয়ারের নামের সাথে ‘স্রেফ ওয়ানডে ব্যাটার’-এর তকমা জুড়ে দেন! ফলে টেস্ট দল থেকে দীর্ঘ তিন বছরের জন্য নির্বাসিত হন তিনি। এই সময়ে পাকিস্তান ৪৮টি টেস্ট খেলে ফেলে! এমনকি ইনজুরি আর রহস্যময় অসুস্থতার জেরে ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ আস্বাদন থেকেও বঞ্চিত হন এই পাক ওপেনার!

কিন্তু যাঁর কবজিতে লুকিয়ে আছে জাদুকরী নান্দনিকতা, তাকে কি দমানো যায়? তাই, ১৯৯৩ সালে শারজাহতে দলে ফিরে চার দিনে করেন টানা তিনটি সেঞ্চুরি! আর টেস্টে ফিরেই ওয়েলিংটনে খেললেন ১৬৯ রানের এক ক্যামিও ইনিংস। ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে লর্ডসে ৭৪ ও ৮৮ রান করে আরেকবার নিজের জাত চেনান এই ব্যাটার।

এরপর ওভালের তৃতীয় টেস্টে নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যান আনোয়ার। প্রতিপক্ষ বোলাররা অফ স্ট্যাম্পের বাইরে গালিতে ফিল্ডার সাজিয়ে ফাঁদ পাতলেও আনোয়ার নিজের ফুটওয়ার্ক আর মাথার অবস্থান বদলে কবজির সুনিপুণ দক্ষতায় একের পর এক ডেলিভারিকে সীমানা পার করে খেলেন ১৭৬ রানের অনবদ্য ইনিংস!

পরের বছরের ২১ মে চেন্নাইয়ের চিপক স্টেডিয়ামে আসে সাঈদ আনোয়ারের ক্যারিয়ারের সেই সোনালী দিন। ভারতের বোলিং লাইনআপকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে তিনি ১৯৪ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন। ভেঙে দেন ভিভ রিচার্ডসের ১৩ বছরের রেকর্ড।

১৯৯৯ সালে কোলকাতার ইডেন গার্ডেনসে প্রতিকূল উইকেটে আবারও জ্বলে ওঠেন তিনি। ১৮৮ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে একাই দলকে জয়ের বন্দরে পোঁছে দেন এই বাঁহাতি।

পরিসংখ্যানের পাতায় নব্বইয়ের দশকে ওয়ানডে ওপেনার হিসেবে রেকর্ড ৬ হাজারের ওপরে রান করেন সাঈদ আনোয়ার। খোদ সনাথ জয়াসুরিয়া কিংবা শচীন টেন্ডুলকারও তাঁর থেকে পিছিয়ে ছিলেন এই তালিকায়। টেস্টেও তাঁর বিদেশের মাটিতে তিনবার ১৫০ ছাড়ানো বেশি রান করার অনন্য রেকর্ডটি সে যুগের আর কোনো ওপেনারের ছিল না!

তবু, সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকা আনোয়ারের জীবন এক নিমেষে থমকে যায় ২০০১ সালে। তিন বছরের আদরের কন্যা বিসমাহর আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন তিনি। ক্রিকেট ছেড়ে একটুখানি বিশ্রাম আর মানসিক শান্তির জন্য আনোয়ার খুঁজে নেন নতুন এক আশ্রয়—ধর্ম এবং সমাজসেবা। মেয়ের স্মৃতিতে গড়ে তুললেন ‘মাআজ বিন জাবাল মেডিকেল ট্রাস্ট’, যা দুস্থ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে শুরু করে।

পরে অবশ্য দুই বছরের বিরতি কাটিয়ে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেন এই ব্যাটার। তবে আসরটা খুব একটা ভালো যায়নি তাঁর। ৫৪.৫০ গড়ে পাঁচ ইনিংসে ২১৮ রান করেন তিনি। সেই টুর্নামেন্টে তাঁর একমাত্র প্রাপ্তি—ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরিয়নে ১০১ রানের এক ক্ল্যাসিক সেঞ্চুরি! বিশ্বকাপ শেষে পুরোপুরিভাবে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন আনোয়ার।

খেলা ছাড়ার পর আরও আলোচনার আড়ালে চলে যান তিনি। যেন ক্রিকেট দেবতা সাঈদ আনোয়ারকে ব্যবহার করে গাইয়েছেন ব্যাটিং নৈপুণ্যের অমোঘ সংগীত, কিন্তু ক্রিজ থেকে তিনি সরে যাওয়ার সাথে সাথেই তিনি বিস্মৃতির অতলে ডুবে গেছেন ক্রিকেট বোদ্ধা আর দর্শক-সমর্থকদের বেখেয়ালি মনন আর অবমূল্যায়নের কারণে!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

গোল-আকালের অবসান ঘটাবেন রোনান!

বয়সভিত্তিক ফুটবলে রোনান সুলিভান অবশ্য নিজের সামর্থ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৬ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের পথে পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারেও গোল করেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। কৌশলগতভাবে রোনানকে কার্যকর করে তুলতে প্রয়োজন উইং থেকে নির্ভুল ক্রস, মাঝমাঠ থেকে থ্রু পাস এবং আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে দ্রুত বল সরবরাহ। প্রতিপক্ষ নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজালে বক্সে তাঁর পজিশনিং ও ফিনিশিং গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের প্রেসিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্রুত পাসিং, বলের দখল ধরে রাখা এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে কার্যকর উত্তরণ।

Share via
Copy link