ধসে পড়া দুর্গের একক প্রহরী

দিল্লির এক কনকনে শীতের সকালে ধূলিধূসরিত রঞ্জির পিচ থেকে শুরু হয়েছিল যার পথচলা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে এসে তা রূপ নিয়েছিল এক নীরব বিপ্লবে।

ওয়াংখেড়ের গ্যালারি জুড়ে তখন এক দমবন্ধ নীরবতা। ভারতের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন যেন শচীন-শেবাগের বিদায়ের সাথে সাথে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার পথে। ঠিক তখনই ড্রেসিংরুমের দেয়াল ডিঙিয়ে মাঠে নেমেছিলেন গৌতম গম্ভীর। তিনি কোনো রাজকীয় সংবর্ধনা নিয়ে আসেননি, ব্যাটে ছিল না কোনো অলৌকিক আলোর ঝিলিক, কিন্তু তাঁর চোয়ালবদ্ধ চেহারায় আর চোখে ছিল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ইতিহাস বদলে দেওয়ার এক সুতীব্র জেদ।

ম্যাচের পরিসংখ্যান আপনাকে শুধু ৯৭ রানের একটা হিসেব দেবে, কিন্তু সেই বিকেলে গম্ভীরের ধুলোমাখা জার্সি, হাঁটুতে লেগে থাকা কাদা আর প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার ছবিটা বলে দেয় – তিনি স্রেফ একজন ব্যাটার ছিলেন না, ছিলেন এক রণক্ষেত্রের নি:সঙ্গ সৈনিক।

গম্ভীরকে বুঝতে হলে অলঙ্কৃত পরিসংখ্যানে আটকে থাকলে চলবে না, তাকাতে হবে তাঁর ক্ষুরধার ও আপসহীন আত্মার দিকে। দিল্লির এক কনকনে শীতের সকালে ধূলিধূসরিত রঞ্জির পিচ থেকে শুরু হয়েছিল যার পথচলা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে এসে তা রূপ নিয়েছিল এক নীরব বিপ্লবে।

২০০৭ সালের সেই মহাযুদ্ধে যখন একে একে তাবড় তারকারা প্যাভিলিয়নের পথ ধরছেন, তখন একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গম্ভীর হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত এক দুর্গ। পাকিস্তানের বোলারদের অগ্নিঝরা বোলিংকে তিনি বুক চিতিয়ে সামলে নিয়েছিলেন। ৫৪ বলে খেলা তাঁর সেই ৭৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসটি কেবল কিছু রানের সমষ্টি ছিল না। সেটি ছিল পরাধীন এক ছাই থেকে নতুন এক সূর্যোদয়ের ইতিহাস, যা ভারতকে এনে দিয়েছিল বিশ্বজয়ের স্বাদ।

​চার বছর পর ২০১১-র ফাইনালে তিলকরত্নে দিলশানের ওভারে ডাইভ দিয়ে যখন তিনি রান পূর্ণ করলেন, তাঁর ধবধবে সাদা জার্সিতে লেগে গেল কাদা আর ধুলো। সেই ধুলোমাখা পোশাকটিই ছিল দেশপ্রেমের অমর দলিল। সেঞ্চুরি থেকে তিন রান দূরে আউট হয়ে ফেরার সময় তাঁর চোখে ব্যক্তিগত আক্ষেপ ছিল না, ছিল দেশের জয় নিশ্চিত করার প্রশান্তি।

মাঠের বাইরেও তিনি ছিলেন অনন্য। ২০০৯ সালে ইডেন গার্ডেন্সে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ১৫০ রান করে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হয়েও সেই পুরস্কার নিজে না নিয়ে তুলে দিয়েছিলেন প্রথম সেঞ্চুরি করা তরুণ বিরাট কোহলির হাতে। পরবর্তীতে কলকাতার নাইট রাইডার্সকে দুইবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন করে তিনি প্রমাণ করেন নিজের তুখোড় নেতৃত্বগুণ।

খেলোয়াড় হিসেবে যেমন দেশকে রাজমুকুট পরিয়েছেন, তেমনি সাজঘরের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে হেড কোচ হিসেবেও তাঁর জয়ের ক্ষুধা থামেনি। তাঁর মাস্টারমাইন্ড ও নির্ভীক স্ট্র্যাটেজিতেই ভারত ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয় করে এবং ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ফের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। গম্ভীর কোনো আলোর ছটায় ভেসে যাওয়া নায়ক নন। তিনি নি:শব্দে পাহাড়ে পথ বানিয়ে চলা এক সংকল্পবদ্ধ সেনাপতি, যার প্রতিটি পদক্ষেপে খোদাই করা আছে বিজয়ের অবিনশ্বর ইতিহাস।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

গোল-আকালের অবসান ঘটাবেন রোনান!

বয়সভিত্তিক ফুটবলে রোনান সুলিভান অবশ্য নিজের সামর্থ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৬ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের পথে পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারেও গোল করেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। কৌশলগতভাবে রোনানকে কার্যকর করে তুলতে প্রয়োজন উইং থেকে নির্ভুল ক্রস, মাঝমাঠ থেকে থ্রু পাস এবং আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে দ্রুত বল সরবরাহ। প্রতিপক্ষ নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজালে বক্সে তাঁর পজিশনিং ও ফিনিশিং গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের প্রেসিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্রুত পাসিং, বলের দখল ধরে রাখা এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে কার্যকর উত্তরণ।

আফগান ঘূর্ণির মায়াজালে ধরাশায়ী হবে মিরাজ-রাজারা?

তবে স্পিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্পিনাররা শিকার করেছেন মোট ৮২টি উইকেট। যদিও চলতি বছরে ১২ ম্যাচে স্পিন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২৬ উইকেট, ২০২৫ সালে ১১ ম্যাচে রিশাদ, মিরাজ, তানভীর, নাসুমদের শিকার ছিল ৫৬ উইকেট। গত বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচেই স্পিন সহায়ক উইকেট থাকলেও চলতি বছরে দলটি খেলেছে তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে। ফলে কন্ডিশনের সহায়তা পেলে বাংলাদেশের স্পিনাররাও যে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে সক্ষম, তার ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই। রিশাদ হোসেনের আক্রমণাত্মক লেগ স্পিন, মেহেদী হাসান মিরাজের নিয়ন্ত্রিত অফ স্পিন, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে নতুন সংযোজন রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম। বৈচিত্র্য আর কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে মরণকামড় দিতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশও।

Share via
Copy link