​আধুনিক ক্রিকেটে পাক ব্র্যান্ডের সবচাইতে রাজকীয় মুখ

যখনই কোনো তরুণ ক্রিকেটার ব্যাটের ফেস খুলে ব্যাকফুট পাঞ্চ কিংবা কাভার ড্রাইভ খেলবে, তারা বাবরের রাজকীয় ছবিটির কথাই মনে করবে।

আধুনিক ক্রিকেটের গতিময় তাণ্ডব আর চড়াও মারকুটের যুগে তিনি যেন এক চিরন্তন ক্লাসিক কাব্য। পাওয়ারপ্লের তোড়জোড় বা চার-ছক্কার উন্মাদনার মাঝেও যিনি ব্যাটের নিখুঁত ফেস খুলে কভার ড্রাইভ খেলেন, ক্রিকেটবিশ্ব একমুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে দেখে – সৌন্দর্য কাকে বলে। তিনি বাবর আজম।

​লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের গ্যালারির সীমানা ঘেঁষে একসময় বল কুড়াতো এক রোগা-পটকা কিশোর। ২০০৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। বাউন্ডারি লাইনের ওপারে বসে তরুণ বাবর অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখতেন এবক ডি ভিলিয়ার্স কিংবা ইনজামাম-উল-হকের শট। দিনশেষে বল কুড়িয়ে পাওয়া সামান্য টাকা আর মাঠের মাটি গায়ে মেখে বাড়ি ফেরার পথে বাবরের চোখে ছিল এক অদম্য স্বপ্ন। একদিন লাহোরের এই স্টেডিয়াম তাঁর নাম ধরে চিৎকার করবে।

​সেই স্বপ্ন কোনো জাদুমন্ত্রে সত্যি হয়নি। ক্রিকেট পরিবারের রক্ত তাঁর ধমনীতে বয়ে গেলেও, বাবর নিজের পথ তৈরি করেছেন ঘাম আর অশ্রু দিয়ে। কঠোর অনুশীলন, বাবার ত্যাগ আর নিজের ওপর বিশ্বাসকে মূলধন করে ২০১৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাকিস্তানের সবুজ জার্সিতে তাঁর অভিষেক ঘটে।

২০১৬ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টানা তিনটি ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে বাবর জানান দিয়েছিলেন, এক নতুন রাজার আগমন ঘটেছে। এরপর তিন ফরম্যাটেই পাকিস্তান ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ হয়ে ওঠেন তিনি। বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ, জো রুটদের সমান্তরালে বাবর গড়ে তোলেন নিজের এক স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য।

২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। দুবাইয়ের আকাশে তখন চরম উত্তেজনা। ভারতের বিরুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান কখনোই জিততে পারেনি- এই জট ভাঙার ঐতিহাসিক মিশনে অধিনায়ক হিসেবে টস করতে নামেন বাবর। ঠিক সেই ম্যাচের সময় লাহোরের এক হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন বাবরের মা। ভেন্টিলেটরে থাকা মায়ের কথা ভেবে বাবরের বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু দলের সামনে অধিনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন অবিচল, শান্ত ও পর্বতসম দৃঢ়।

​সেই রাতে শাহিন আফ্রিদির বোলিং তাণ্ডবের পর ব্যাট হাতে এক ফোঁটা ভুল না করে বুকচিতিয়ে লড়েছিলেন বাবর ও রিজওয়ান। ভারতকে হারিয়েছিল দশ উইকেটে, ভেঙেছিল বছরের পর বছর ধরে ঝুলে এক লজ্জাজনক তকমা। ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে ফিরে বাবর যখন চোখের জল ফেলছিলেন, বিশ্ব তখন জেনেছিল – এক বীর কেবল ব্যাটে নয়, হৃদয়ের শক্তিতেও মহান হতে পারেন।

পাকিস্তানের ক্রিকেটের ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই নির্দয়। নেতৃত্ব হারানোর যন্ত্রণা, স্ট্রাইক রেট নিয়ে ট্রোল, অফ-ফর্ম আর পিসিবির অভ্যন্তরীণ নাটকের শিকার হতে হয়েছে বাবরকেও। কিন্তু কিংবদন্তিদের চেনার উপায় হলো – পতন থেকে তাঁরা কীভাবে উঠে দাঁড়ান। বাবর আজম সমালোচনার জবাব মুখে কম দিয়ে ব্যাটে দিয়েছেন বেশি। ফর্ম খোয়ানোর পরও নেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়ে আবার ফিরে এসেছেন চেনা ছন্দে।

লাহোরের বল কুড়ানো বালকটি আজ বিশ্ব ক্রিকেটের সেরাদের একজন। বাবর আজম কেবল একজন ক্রিকেটার নন। তিনি কোটি পাকিস্তানির আশা, শান্ত মেজাজের এক যোদ্ধা এবং বর্তমান যুগের ব্যাটিং নান্দনিকতার সেরা বিজ্ঞাপন।

গ্যালারিতে আলো জ্বলবে, বোলারদের পরিবর্তন হবে, ক্রিকেটের গতি আরও বাড়বে। কিন্তু যখনই কোনো তরুণ ক্রিকেটার ব্যাটের ফেস খুলে ব্যাকফুট পাঞ্চ কিংবা কাভার ড্রাইভ খেলবে, তারা বাবরের রাজকীয় ছবিটির কথাই মনে করবে। বাবর আজমের মহাকাব্য এখনও লেখা হচ্ছে, শেষ অধ্যায় যে অনেক দূরে!

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

আফগান ঘূর্ণির মায়াজালে ধরাশায়ী হবে মিরাজ-রাজারা?

তবে স্পিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্পিনাররা শিকার করেছেন মোট ৮২টি উইকেট। যদিও চলতি বছরে ১২ ম্যাচে স্পিন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২৬ উইকেট, ২০২৫ সালে ১১ ম্যাচে রিশাদ, মিরাজ, তানভীর, নাসুমদের শিকার ছিল ৫৬ উইকেট। গত বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচেই স্পিন সহায়ক উইকেট থাকলেও চলতি বছরে দলটি খেলেছে তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে। ফলে কন্ডিশনের সহায়তা পেলে বাংলাদেশের স্পিনাররাও যে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে সক্ষম, তার ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই। রিশাদ হোসেনের আক্রমণাত্মক লেগ স্পিন, মেহেদী হাসান মিরাজের নিয়ন্ত্রিত অফ স্পিন, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে নতুন সংযোজন রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম। বৈচিত্র্য আর কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে মরণকামড় দিতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশও।

Share via
Copy link