গ্লাভসে লুকিয়ে ছিল বিশ্ব জয়ের রহস্য

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট যখন ক্রিজে গার্ড নিচ্ছিলেন, আপাতদৃষ্টিতে তাকে অতি সাধারণ এক যোদ্ধা বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই সাধারণত্বের আড়ালে বাম হাতের গ্লাভসে লুকানো ছিল এক অদ্ভুত রহস্য। ছোট্ট একটি স্কোয়াশ বল।

২০০৭ সালের ২৮ এপ্রিল। বার্বাডোজের কেনসিংটন ওভাল তখন জনসমুদ্র। বিশ্বকাপের ফাইনাল – ক্রিকেটীয় আভিজাত্য আর শ্রেষ্ঠত্বের এক অগ্নিপরীক্ষা। অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট যখন ক্রিজে গার্ড নিচ্ছিলেন, আপাতদৃষ্টিতে তাকে অতি সাধারণ এক যোদ্ধা বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই সাধারণত্বের আড়ালে বাম হাতের গ্লাভসে লুকানো ছিল এক অদ্ভুত রহস্য। ছোট্ট একটি স্কোয়াশ বল। কেউ জানত না, এই সামান্য রাবারখণ্ডটিই সেদিন বাইশ গজের ব্যাকরণ নতুন করে লিখতে যাচ্ছে।

গল্পের প্রেক্ষাপট অবশ্য বার্বাডোজ নয়, বরং পার্থের এক নির্জন নেট সেশন। নিজের ব্যাটিংয়ের গ্রিপ নিয়ে তখন দিশেহারা গিলক্রিস্ট। অবচেতন মনেই ব্যাটের হাতল বড্ড শক্ত করে চেপে ধরছিলেন তিনি, ফলে শটগুলো তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলছিল। ত্রাতা হয়ে এলেন গুরু বব মিউলেম্যান। সমাধান হিসেবে গিলক্রিস্টের গ্লাভসের ভেতর গুঁজে দিলেন একটি স্কোয়াশ বল।

​যুক্তিটা ছিল চমৎকার। গ্লাভসের ভেতরের ঐ বলটি হাতের মুঠোকে খুব বেশি শক্ত হতে দেবে না। ফলে উপরের হাতের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং ব্যাটের সুইং হবে ঝরনার মতো সাবলীল। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে নেটে এই কৌশল ঝালাই করলেও মূল ম্যাচে তা ব্যবহারের সাহস করেননি গিলক্রিস্ট। তিনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজিটি তুলে রেখেছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মঞ্চের জন্য।

বৃষ্টিভেজা সেই দুপুরে লঙ্কান আক্রমণের সামনে গিলক্রিস্ট যখন ব্যাট হাতে শাসন শুরু করলেন, তখন মাঠের চারদিকে যেন স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছুটছিল। মালিঙ্গার গতি কিংবা মুরালির মায়াবী ঘূর্ণি, কোনো কিছুই সেদিন তাকে শিকল পরাতে পারেনি। মাত্র ৭২ বলে যখন তিনি শতরানের ম্যাজিক্যাল ফিগার স্পর্শ করলেন, তখনই বিশ্ববাসী দেখল এক অমীমাংসিত দৃশ্য। গিলক্রিস্ট তার বাম হাতের গ্লাভস উঁচিয়ে নির্দিষ্ট এক জায়গায় আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিলেন।

​ধারাভাষ্যকারদের বিস্ময় আর দর্শকদের কৌতূহলকে ছাপিয়ে সেই সংকেতটি ছিল আসলে হাজার মাইল দূরে টিভির সামনে বসে থাকা কোচের প্রতি এক নীরব কৃতজ্ঞতা। এটি ছিল এক শিষ্যের পক্ষ থেকে গুরুকে দেওয়া সেরা দক্ষিণা।

১০৪ বলে ১৪৯ রানের সেই বিধ্বংসী ইনিংসটিই আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। বার্বাডোজের সেই তপ্ত দুপুরে গিলক্রিস্ট প্রমাণ করেছিলেন, সাধারণ একটি রাবারখণ্ডও যদি সঠিক জহুরির হাতে পড়ে, তবে তা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link