অতি লোভে তাঁতি নষ্ট

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু ডানা ছাড়িয়ে যখন কেউ পুরো আকাশটাকেই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানাতে চায়, তখন ভারসাম্য হারানোটা কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

​গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা যখন অতল গহ্বরে গিয়ে আছড়ে পড়ে, তখন তার প্রতিধ্বনি হয় ভয়াবহ। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম মহানায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল কি কেবল সময়ের শিকার, নাকি নিজেরই গড়া অহমিকার কারাগারে বন্দি এক ট্র্যাজিক চরিত্র? বিসিবির মসনদ থেকে তার এই ন্যাক্কারজনক বিদায় কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক সুনিপুণ আত্মহননের মহাকাব্য।

তার সামনে সুযোগ ছিল বরপুত্র হওয়ার। কথা ছিল তিনি আসবেন ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাতে, একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে শুদ্ধি অভিযান শেষ করে রাজকীয় বিদায় নেবেন। কিন্তু ক্ষমতার মোহ বড় সংক্রামক। যে হাত দিয়ে তিনি ক্রিকেটের ক্ষত মুছতে চেয়েছিলেন, সেই হাত দিয়েই তিনি আঁকড়ে ধরলেন চিরস্থায়ী গদি।

উপদেষ্টা মহলের সাথে দ্বৈরথ আর নৈতিকতার বিসর্জন – বুলবুলের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল তার নিজেরই লিগ্যাসির মূলে কুঠারাঘাত। আইসিসি-এসিসির অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ যে মানুষটি ক্রিকেটের ভগ্নদশা সারানোর স্বপ্ন ফেরি করতেন, তিনি নিজেই একসময় হয়ে উঠলেন সেই সিস্টেমের সবচেয়ে বড় অসুখ।

সবচেয়ে নাটকীয় ছিল তার শেষবেলার দৃশ্যপট। একদিকে তিনি যখন পূর্বাচলের আকাশে স্টেডিয়ামের আলপনা আঁকছিলেন, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে তার বিদায়ঘণ্টা বেজে উঠেছিল। বিকেলের সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে দপ্তরে আসা মানুষটি যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে পেছনের দরজা দিয়ে এক পরাজিত ছায়ার মতো মিলিয়ে গেলেন, তখন বোঝা গেল দম্ভের আয়ু কতটুকু।

আজ তার ঘনিষ্ঠজনরাও তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে ব্যতিব্যস্ত। যে সহকর্মীরা তাকে ঘিরে স্তুতি গাইতেন, তারা এখন ব্যর্থতার দায় সযত্নে বুলবুলের কাঁধে চাপিয়ে দায়মুক্ত হতে চাইছেন। এনএসসি কর্মকর্তারা তো সরাসরি তার দিকে নির্বাচনী কারচুপির আঙুল তুলেছেন, যা প্রমাণ করে দেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে অর্জিত তার সব সম্মান আজ ধুলোয় লুণ্ঠিত।

পরিশেষে এটুকুই বলা যায়, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু ডানা ছাড়িয়ে যখন কেউ পুরো আকাশটাকেই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানাতে চায়, তখন ভারসাম্য হারানোটা কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বুলবুল চেয়েছিলেন সবকিছু নিজের দখলে রাখতে – একসাথে ক্ষমতা, সম্মান আর প্রতিপত্তি। কিন্তু সীমার অতিরিক্ত পাওয়ার সেই দুর্নিবার তৃষ্ণাই আজ তাকে নি:স্ব করে দিল।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link