আনন্দ সামারাকুন, ক্রিকেট মঞ্চের সঙ্গীত সাধক

শেষ জীবন সুন্দর ছিল না সামারাকুনের। জাতীং সঙ্গীতের জন্য আত্মহত্যা করা একমাত্র জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতাও তিনি। ১৯৬২ সালের এক রাতে তিনি এক গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শেষ বিদায় নেন। সঙ্গীতের ওপর সরকারী হস্তক্ষেপ তিনি মেনে নিতে পারেননি।

ক্রিকেট কি গানের মতই নয়? সুরেলা কোনো সিম্ফোনিতেই তো ড্যান্সিং ডাউন দ্য ট্র্যাকে যান ব্যাটাররা। কিংবা চোখ ধাঁধানো কোনো ফিল্ডিং, অথবা ফাটল ধরা পঞ্চম দিনের উইকেটের অবিশ্বাস্য টার্ন – এ তো সুরের মূর্ছনার চাইতেও মায়াবী।

ক্রিকেটের ছন্দে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। আজও যখন ভারত ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের ময়দানে মুখোমুখি হয়, তখন সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে এক হয়ে ওঠে একটা বাস্তবতা, দু’টো দেশের ক্রিকেটাররাই গলা মেলান একই রচয়িতার জাতীয় সঙ্গীতে।

২০১১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। বিশ্বকাপের মঞ্চ। মুখোমুখি বাংলাদেশ ও ভারত। জয়-পরাজয় ছাপিয়ে ম্যাচ শুরুর আগেই ইতিহাসের পাতায় ঠাই করে নিল সেই ম্যাচ। দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠতেই ক্রিকেটের ময়দানে আরও একবার জয় হল নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথের।

সেটা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০ তম জন্মবার্ষিকীর বছর। এর চেয়েও ঐতিহাসিক ব্যাপার হল, সেই বিশ্বকাপের আরেক আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত ‘শ্রী লঙ্কা মাতা’-তেও রয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানের সুর ও ভাবনার অনুভব।

এই গানটির রচনা ও সুর করেছিলেন আনন্দ সামারাকুন। সেটা ১৯৩৯ কি ১৯৪০ সালের দিকে। তখন তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র, শান্তিনিকেতনের বিশ্ব ভারতীতে। যদিও মাত্র ছয় মাসের জন্য সেখানে ছিলেন, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

পরে, তিনি আবার শান্তিনিকেতন থেকে শ্রীলঙ্কায় ফিরে এসে গড়ে তোলেন সিংহলিজ গানের এক নতুন ধারা। সিংহলিজ গানের সুর হঠাৎ শুনলে চিরচেনা কোনো বাংলা গান ভেবে যে কারোরই ভুল হতে পারে।

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, সামারাকুনের লেখা গানে ঠাকুর হয়তো সুরের কিছু অংশে সহায়তা করেছিলেন। তবে, ভারতীয় ইতিহাসবিদ লিপি ঘোষ ও শ্রীলঙ্কান ইতিহাসবিদ সন্দাগোমি কোপেরাহেয়া এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে ঠাকুর সরাসরি এই গানের সৃষ্টিতে জড়িত ছিলেন না।

শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পর সামারাকুন শ্রীলঙ্কার গলের খ্যাতনামা মাহিন্দা কলেজে সংগীত শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।  ‘নমো নমো মাতা’ নামে গানটি প্রথম গাওয়া হয় ওই কলেজেরই শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে।

পরে কলম্বোর মিউস্যাস কলেজের ছাত্রীরা একটি অনুষ্ঠানে এই গান পরিবেশন করলে তা তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সে সময়ের সিলন জুড়ে রেডিওতে বাজতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালে সিলন স্বাধীন হয়ে হয় শ্রীলঙ্কা, ১৯৪৯ সালে প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে বাজে এই গান।

যদিও, ১৯৬১ সালে সরকারী আদেশে ‘নমো নমো মাতা’ হয়ে যায় ‘শ্রী লঙ্কা মাতা’। গানটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি আসে ১৯৭৮ সালে। এটাই পৃথিবীর একমাত্র জাতীয় সঙ্গীত যেটা গাওয়া হয় দু’টি ভিন্ন ভাষায়, তামিল ও সিংহলিজ ভাষায়।

অবশ্য, শেষ জীবন সুন্দর ছিল না সামারাকুনের। জাতীয় সঙ্গীতের জন্য আত্মহত্যা করা একমাত্র জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতাও তিনি। ১৯৬২ সালের এক রাতে তিনি এক গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শেষ বিদায় নেন। সঙ্গীতের ওপর সরকারী হস্তক্ষেপ তিনি মেনে নিতে পারেননি।

অবশ্য, নিজের অমর সৃষ্টি দিয়ে তিনি শ্রীলঙ্কায় বেঁচে থাকবেন চিরকাল। সামারাকুনের গানের সাথেই আবার ক্রিকেট বা রবীন্দ্রনাথ মিলেমিশে একাকার। ঠাকুর মশাইয়ের শীষ্য আনন্দ যে কলেজে গানের তালিম দিতেন, সেখান থেকে পরবর্তীতে বেড়িয়ে এসেছেন মারভান আতাপাত্তু কিং লাসিথ মালিঙ্গার মত ক্রিকেটার। সত্যিই, ক্রিকেট পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতের মতই সুরেলা।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link