এক স্লোগানের দুই অনন্ত আক্ষেপ

সাব্বিরের ক্রিকেট জীবনও আশরাফুলের পথেই হাঁটছে, জাতীয় দলের বাইরে থাকছেন, কখনও ঝলক দেখাচ্ছেন, নিয়মিত হতে পারছেন না কখনওই, শেষ যাত্রায় কি সেই আশরাফুলীয় ইতিই টানবেন সাব্বির? প্রশ্নের জবাব সাব্বির ছাড়া আর কেউ জানেন না।

বিপর্যয় ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট ভাবাই যায় না। আর যখনই বিপর্যয়, তখনই সমর্থকদের মুখে পুরনো কিছু সেনানীর নাম আসে ঘুরে ফিরে। এক কালে সেই জায়গায় ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, এখন যেমন সেই একই পদে বসেছেন সাব্বির রহমান রুম্মান। ‘আশরাফুলকে দলে চাই’ থেকে স্লোগানটা এখন ‘সাব্বিরকে দলে চাই’।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার গল্পটা আসলে কেবল মাঠের নয় — এটা আবেগের, সময়ের, আর স্মৃতির গল্প। সেই গল্পে মোহাম্মদ আশরাফুল এমন এক চরিত্র, যিনি ব্যাট হাতে কেবল রানই করেননি, করেছেন ভালোবাসা ও হতাশার সমীকরণ, ফিক্সিং বিতর্কে নির্বাসনেও গিয়েছেন। আর সাব্বির রহমান — এক ভিন্ন ছন্দের মানুষ; আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী, কখনো বিতর্কিত, কিন্তু সবসময় আলোচনায়।

আশরাফুল যেন এক কবিতার নাম, যার প্রতিটি লাইনই পূর্ণ উচ্ছ্বাসে শুরু হয়, আর শেষ হয় এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসে। ২০০১ সালের সেই শ্রীলঙ্কার মাটিতে যখন কিশোর আশরাফুল ভাস-মুরালিদের মতো শক্তিশালী বোলিং লাইনআপের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করলেন, পুরো বাংলাদেশ যেন একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছিল টেলিভিশনের সামনে — ‘আমরাও পারি’ বলার এক নতুন সাহস পেয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমর্থকরা।

তারপর থেকে যতবারই তাঁর ব্যাট যখন হাসতো, মনে হতো এ দেশের ক্রিকেটের সীমান্ত আরও একটু বড় হলো। কিন্তু ক্রিকেটের বাইরের বাস্তবতা, ফিক্সিংয়ের কলঙ্ক, নিষেধাজ্ঞার অন্ধকার — সব মিলিয়ে আশরাফুল হয়ে উঠলেন এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের নায়ক, যিনি শেষ পর্যন্ত হয়তো কাঙ্ক্ষিত পরিণতি পাননি, কিন্তু হৃদয়ে তাঁর জায়গা কেউ নিতে পারেনি।

অন্যদিকে সাব্বির রহমানের গল্পটা যেন আধুনিক শহরের আলো ঝলমলে বিজ্ঞাপনচিত্রের মতো — দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তীব্র গতি আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে গল্পের গভীরতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল আগুন, ছিল স্টাইল, ছিল নির্ভীকতা।

মাঠে তাঁর উপস্থিতি, হাসির ভঙ্গি, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর সরাসরি যোগাযোগ, কখনও বিতর্কিত সব সব ঘটনা — সব মিলিয়ে সাব্বির এক আধুনিক সময়ের ক্রিকেটার, যিনি সমর্থকদের সঙ্গে মাঠের বাইরেও যুক্ত থাকতে পেরেছেন। তবে পারফরম্যান্সের দিক থেকে ধারাবাহিকতা না থাকায়, তাঁর জনপ্রিয়তা অনেক সময় ‘তরঙ্গের’ মতো এসেছে আর গিয়েছে।

সাব্বির রহমান বাংলাদেশের আধুনিক ক্রিকেট প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল আগ্রাসন, আত্মবিশ্বাস আর ক্যারিশমা, যা ২০১৬ সালের এশিয়া কাপের সময় তাকে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলে। মাঠে তাঁর স্টাইল, ফিল্ডিং দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসী মেজাজ তাঁকে তরুণ দর্শকের কাছে একসময় বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। তাঁর মত পাওয়ার হিটার বাংলাদেশে খুব কমই আছে। এখনও যখন বিপিএল, এনসিএল বা ঢাকা লিগে ছক্কা হাঁকান, একটা আক্ষেপের ঝড় ওঠে।

কিন্তু আশরাফুলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। তাঁকে নিয়ে আলোচনা মানেই একধরনের আবেগময় নস্ট্যালজিয়া ফিরে আসে। তিনি যেন এক সময়ের প্রতীক, যখন বাংলাদেশের ক্রিকেট কেবল বেড়ে উঠছে, স্বপ্ন দেখেছে, ব্যর্থতার মধ্যেও সম্ভাবনার আলো খুঁজেছে।

আশরাফুল যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক অনন্ত উপমা — যার জয়-পরাজয়, সাফল্য-বিফলতা, সবই মিশে আছে দেশের ক্রিকেটীয় আত্মার ভেতর। ক্রিকেট ব্যাট তুলে রেখে আশরাফুল এখন কোচিং করান, টেলিভিশনে অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেন। বুক ভরা আক্ষেপ সঙ্গী হয় তাঁর।

সাব্বিরের ক্রিকেট জীবনও আশরাফুলের পথেই হাঁটছে, জাতীয় দলের বাইরে থাকছেন, কখনও ঝলক দেখাচ্ছেন, নিয়মিত হতে পারছেন না কখনওই, শেষ যাত্রায় কি সেই আশরাফুলীয় ইতিই টানবেন সাব্বির? প্রশ্নের জবাব সাব্বির ছাড়া আর কেউ জানেন না।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link