তিন দেশের টানাপোড়েনে অনিশ্চিত এশিয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ

এশিয়ান ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরেই আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই পরিচিত চেহারাকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পর এবার ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট টানাপোড়েন যুক্ত হয়ে এশিয়ার ক্রিকেট রাজনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে।

এশিয়ান ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরেই আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই পরিচিত চেহারাকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পর এবার ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট টানাপোড়েন যুক্ত হয়ে এশিয়ার ক্রিকেট রাজনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে।

সাম্প্রতিককালে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জবাবে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। শুধু তাই নয়, ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ এ বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিও তোলে বিসিবি। ফলে, স্পষ্টতই ভারত-পাকিস্তান সংকটের পর এশিয়ান ক্রিকেটে যুক্ত হলো আরেকটি বড় ফাটল।

এশিয়ান ক্রিকেটে এই অস্থিরতার শিকড় নতুন নয়। প্রায় ১৮ বছর আগে, ২০০৮ সালে, মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত আইপিএল থেকে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের নিষিদ্ধ করে। এরপর ২০১২-১৩ মৌসুমে ভারতে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক সিরিজই হয়ে যায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শেষ সরাসরি দ্বৈরথ। এরপর থেকে কেবল আইসিসি টুর্নামেন্ট বা এশিয়া কাপের মতো বহুজাতিক আসরেই মুখোমুখি হয়েছে তারা।

ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই। এ সময় ভারতীয় বিভিন্ন মিডিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার গুজব রটনা শুরু করে। এমনকি লিটন দাশের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো মিথ্যা সংবাদও উপস্থাপন করে ভারত। অথচ সে কিনা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ও জনমানুষের প্রাণভোমরা।

এইসব ঘটনার প্রভাব পড়ে ক্রীড়াক্ষেত্রেও। গত বছর বিসিসিআই যখন ভারতীয় পুরুষ ও নারী দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে, তখনই সংকটের প্রথম স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। আর দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত ধাক্কাটি আসে আইপিএল ২০২৬ থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায়।

এরপর বিসিবির পক্ষ থেকে বিসিসিআই ও ভারতের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। বিসিবি থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভারতে বিশ্বকাপ খেলবে না বাংলাদেশ।

এই তিন দেশের টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে এশিয়া কাপে। গত ৪১ বছর ধরে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) যে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আসছে, সেটির কাঠামোই এখন প্রশ্নের মুখে। ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়া কাপ আয়োজন হয়েছে হাইব্রিড মডেলে।

২০২৩ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক আয়োজক হলেও ফাইনালসহ ভারতের সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় শ্রীলঙ্কায়। ২০২৫ সালে আবার ভারত আয়োজক হলেও পুরো টুর্নামেন্ট সরিয়ে নেওয়া হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এখন ভারত-বাংলাদেশ সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বাস্তবতা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের মাটিতে এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দল পাঠাবে না। আবার বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হলে ভারত দল পাঠাবে না।  এই অবস্থান এশিয়া কাপের মূল দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কারণ, এই টুর্নামেন্টের লক্ষ্যই ছিল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্রিকেটীয় সৌহার্দ্য গড়ে তোলা। কিন্তু ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নীতিগত বিরোধিতা এখন দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটকে ঠেলে দিচ্ছে হুমকির পথে।

 

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link