বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবারও অস্থিরতার হাওয়া। প্রশাসনিক টানাপোড়েন, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ আর আন্তর্জাতিক চাপের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেন এক অদৃশ্য দড়ি টানাটানির খেলায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
সোমবার এক বিবৃতিতে বিসিবি সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গেজেটের মাধ্যমে গত অক্টোবরের নির্বাচনের তদন্তে কমিটি গঠনের উদ্যোগকে তারা দেখছে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও স্বাধীনতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে।
বিসিবির ভাষ্য পরিষ্কার—তারা একটি ‘বৈধভাবে নির্বাচিত ও পূর্ণ কার্যকর’ বোর্ড, যা নিজস্ব সংবিধান ও কাঠামো অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার মাঝেই এই তদন্ত উদ্যোগ তাদের মতে তৈরি করছে অনিশ্চয়তার ছায়া।
আর এখানেই এসে পড়ছে আন্তর্জাতিক মাত্রা। কারণ বিসিবি পরিচালিত হয় আইসিসি-র নীতিমালার অধীনে। বোর্ডের আশঙ্কা—সরকারি হস্তক্ষেপ হিসেবে যদি এই উদ্যোগ ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে আইসিসির পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক বা নজরদারিমূলক পদক্ষেপ আসতে পারে।

এদিকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। তার মতে, অভিযোগগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। নির্বাচনকে ঘিরে ‘অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহার’-এর অভিযোগ খতিয়ে দেখতেই এই তদন্ত কমিটি। পাঁচ সদস্যের এই কমিটি ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেবে, আর তার পরই আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আমিনুল হক সরাসরি বলেছেন, ‘গত বছরের নির্বাচনে সরকারি হস্তক্ষেপ ছিল—এটা আমরা সবাই জানি।’ তার দাবি, ঢাকা ক্লাব ও বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল-ও। নির্বাচনের আগেই তিনি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ তুলে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। অভিযোগ ছিল—মনোনয়ন জমার সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো, জেলা কাউন্সিলর পরিবর্তনে প্রভাব খাটানো—এসবই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও তৎকালীন বোর্ড সভাপতি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
তদন্ত কমিটি এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে—বিশেষ করে জেলা প্রশাসকদের মনোনয়ন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশনারদের ভূমিকা, বোর্ড পরিচালকদের অবস্থান—সবকিছুই আসবে তদন্তের আওতায়।

এর মধ্যেই নতুন আরেকটি ইস্যু সামনে আনছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা—টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি। ভারত ও শ্রীলঙ্কিতে অনুষ্ঠিত আসরে নিরাপত্তা ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, সেটিও খতিয়ে দেখতে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে দৃশ্যপটটা এমন—একদিকে বিসিবি চাইছে নিজেদের প্রশাসনিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে, অন্যদিকে সরকার চাইছে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি, যার একটিমাত্র সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে পুরো সমীকরণ।
সংলাপের টেবিলে এই টানাপোড়েনের শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকে, আর বাংলাদেশের ক্রিকেট কতটা অক্ষত থাকে এই ঝড়ের মধ্যে —সেটাই এখন দেখার বিষয়।










