হারমিত সিংয়ের বদলে যাওয়া জীবন!

২০১৩ সালের আইপিএল স্পট ফিক্সিং কাণ্ডে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যদিও পরে তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবু সেই অধ্যায় তাঁর ক্যারিয়ারে এক ধরনের ছায়া ফেলে। এরপরই আসে ২০১৭ সালের সেই আলোচিত গ্রেপ্তারের ঘটনা, যা তাঁর ক্রিকেটজীবনকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

আন্ধেরি রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, ভোরের আধো আলো, যাত্রীদের ভিড়। হঠাৎ করেই প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ে একটি গাড়ি। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। মানুষ ছোটাছুটি শুরু করে, কেউ বুঝে উঠতে পারে না কী হচ্ছে। গাড়িটি থামে রেললাইনের পাশে। এরপরই খবর, গ্রেপ্তার হয়েছেন এক সময়ের ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটার হারমিত সিং। সালটা ২০১৭। সেই ঘটনার পর অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল, এখানেই বুঝি শেষ হয়ে গেল এক সম্ভাবনাময় ক্রিকেট ক্যারিয়ার।

সেই হারমিত সিংই আবার ফিরলেন আলোচনায়। তবে এবার ভিন্ন পরিচয়ে, ভিন্ন জার্সিতে। ভারত বনাম যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নামলেন তিনি, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ক্রিকেট দলের বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে। যে মুম্বাই শহর একসময় তাঁর উত্থান দেখেছে, বিতর্কও দেখেছে, সেই শহরেই আবার প্রত্যাবর্তন।

হারমিত সিংয়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুম্বাইয়ে। ছোটবেলা থেকেই মুম্বাইয়ের শক্ত প্রতিভা কাঠামোর ভেতরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বাঁহাতি স্পিনে ছিল আলাদা ধার। সেই ধারই তাঁকে নিয়ে যায় ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন হারমিত। সে সময় তাঁকে ভবিষ্যতের বড় মঞ্চের ক্রিকেটার হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। আইপিএলেও সুযোগ পেয়েছিলেন, পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। ২০১৩ সালের আইপিএল স্পট ফিক্সিং কাণ্ডে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যদিও পরে তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবু সেই অধ্যায় তাঁর ক্যারিয়ারে এক ধরনের ছায়া ফেলে। এরপরই আসে ২০১৭ সালের সেই আলোচিত গ্রেপ্তারের ঘটনা, যা তাঁর ক্রিকেটজীবনকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মুম্বাইয়ে থাকা অবস্থায় ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা তাঁকে ক্রিকেটের মূল স্রোত থেকে আরও দূরে ঠেলে দেয়।

অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই বুঝি হারমিত সিংয়ের গল্প শেষ। কিন্তু ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা এত সহজে ছিন্ন হয়নি। হতাশা, বিতর্ক আর অনিশ্চয়তার ভেতর থেকেই নতুন পথ খুঁজে নেন তিনি। দেশ ছাড়েন, পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। শুরু করেন একেবারে নতুন করে, নতুন পরিবেশ, নতুন লড়াই, নতুন পরিচয় নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে আসে জাতীয় দলের ভাবনায়। অবশেষে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় হারমিত সিংয়ের। এরপর থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন দলের নিয়মিত সদস্য। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছেন ২২টি ওয়ানডে ও ২৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ।

ভারতের বিপক্ষে ওয়াংখেড়ে ম্যাচ ছিল হারমিত সিংয়ের জন্য এক বিশেষ অধ্যায়। যে মাঠে একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন ভারতের হয়ে খেলার, সেই মাঠেই এবার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন জন্মভূমির ব্যাটসম্যানদের দিকে। চার ওভারে ২৬ রান দিয়ে তুলে নেন দুই উইকেট। তাঁর শিকার হার্দিক পান্ডিয়া ও অক্ষর প্যাটেল।

গ্রেপ্তারের সেই বিতর্কিত দিন থেকে ওয়াংখেড়ের আলোঝলমলে মঞ্চ, হারমিত সিংয়ের পথচলা সহজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন পথ পেরিয়েই আজ তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাঁড়িয়ে, ভিন্ন পতাকার নিচে হলেও, নিজের গল্পটা নতুন করে লিখছেন। খেলা যে কখনো শুধু স্কোরকার্ডে সীমাবদ্ধ নয়, হারমিত সিংয়ের জীবন তারই আরেক প্রমাণ। জীবন যে কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় তা বলা মুশকিল তো এ কারণেই।

লেখক পরিচিতি

প্রত্যয় হক কাব্য

স্বপ্ন লেখার কি-বোর্ড

Share via
Copy link