ফুটবল মাঠে তিনি ছিলেন এক ক্লান্তিহীন ইঞ্জিন, আর মাঠের বাইরে অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। হ্যাভিয়ের জানেত্তি – যাঁর কাছে ফুটবল কেবল খেলা নয়, ছিল এক গভীর সাধনা। নিজের বিয়ের রিসেপশনের ঠিক আগে কনের অনুমতি নিয়ে দৌড়াতে যাওয়া এই মানুষটি প্রমাণ করেছিলেন, ফিটনেস আর পেশাদারিত্বের কাছে আবেগও গৌণ।
ইতালিয়ান জাদুকর রবার্তো ব্যাজ্জিও একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন, জানেত্তি ছিলেন ‘ইন্ডেস্ট্রাক্টিবল’ বা অজেয়। অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি রায়ান গিগসের চোখে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ ছিলেন এই আর্জেন্টাইন। ১৯৯৯ সালে ইন্টার বনাম ইউনাইটেড ম্যাচে জানেত্তির সাথে সংঘর্ষে গিগসের নাক ফেটে যাওয়ার ঘটনাটি আজও ফুটবল ইতিহাসে এক রোমাঞ্চকর স্মৃতি। গিগসের ভাষায়, মাঠের ডানপ্রান্ত যেন ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য।
১৯৯২ সালে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলের তৃতীয় বিভাগ থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তার পূর্ণতা পায় ১৯৯৫ সালে ইতালির ইন্টার মিলানে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। দীর্ঘ ১৯ বছর তিনি এই ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।

২০০০ সালের দিকে যখন ইন্টারের সময়টা খারাপ যাচ্ছিল, তখন রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে দলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে। সেখানে গেলে হয়তো ট্রফির ঝুলি আরও ভারী হতো, কিন্তু জানেত্তি বেছে নিয়েছিলেন আনুগত্য।১৭ জন কোচের অধীনে ৮৫৮টি ম্যাচ খেলে গড়েছেন ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড।
আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে ১৪৩টি ম্যাচ খেলা জানেত্তি ৯৮ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে গোলটি করেছিলেন, তা আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভাসে। তবে আক্ষেপ রয়ে গেছে ২০০৬ এবং ২০১০ বিশ্বকাপ নিয়ে। বিশেষ করে ২০১০ এ ম্যারাডোনার জেদ আর অদ্ভুত সিদ্ধান্তে জানেত্তি ও ক্যাম্বিয়াসোকে দলে না রাখাটা আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ভঙ্গুর করে দিয়েছিল, যা জার্মানির বিপক্ষে হারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।
ছোটবেলায় বাবার সাথে রাজমিস্ত্রির কাজ কিংবা কাজিনের সাথে দুধ ফেরি করা – জানেত্তির জীবন ছিল কঠোর সংগ্রামের। তবুও তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। তাঁর সবসময় পরিপাটি আঁচড়ানো চুল ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। জীবনের প্রায় অর্ধশত বৎসর অতিবাহিত করে তাঁর যে চিরতরুণ অবয়ব, তা কেবল সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রারই ফসল। ‘এল ট্রাক্টর’ খ্যাত এই লিজেন্ড বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন, ফুটবল কেবল প্রতিভার নয়, বরং হার না মানা মানসিকতার খেলা।











