লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই অভিশপ্ত রাত। কিলিয়ান এমবাপ্পের বুট থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে আগুন। একের পর এক তিনটি গোল করে একাই গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন আর্জেন্টিনার রক্ষণ। কিন্তু টাইব্রেকারে সব শেষ। মহাকাব্যের শেষে ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন লিওনেল মেসি। নিজের সর্বস্ব দেওয়ার পরও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাতাশ বছরের এই ফরাসি যুবকের চোখের ভাষা বলছিল, ‘এই দিন দিন না, আরও দিন আছে।’
প্যারিসের সেই শহরতলি। যেখানে অভিবাসী জীবনের ক্লান্তি আর স্বপ্ন একাকার হয়ে থাকে। সেখানেই একদিন একটা ছোট্ট ছেলে বল পায়ে দৌড়াত। তার পায়ের গতির কাছে বাতাসও যেন থমকে যেত। তিনিই কিলিয়ান এমবাপ্পে লতিন। আজ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি ফরাসি ফুটবলের সূর্য, যার আলোয় কখনো গোধূলির ছায়া নামে না।
এমবাপ্পের গল্পটা রূপকথার মতো শোনায়, কিন্তু এর পেছনে আছে ইস্পাতকঠিন বাস্তবতা। মোনাকোর হয়ে ইউরোপ কাঁপিয়ে যখন তিনি পিএসজিতে এলেন, তখনই বিশ্ব চিনেছিল এক দুর্দান্ত গতিশীল কিশোরকে। কিন্তু ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ তাকে বসিয়ে দিল রাজসিংহাসনে।

পেলের পর প্রথম কোনো কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার কীর্তি। লুঝনিকি স্টেডিয়ামের সেই রাতে ট্রফিটা যখন তিনি উঁচিয়ে ধরলেন, মনে হচ্ছিল ফুটবল বিশ্ব এক নতুন সম্রাটকে স্বাগত জানাচ্ছে। জিনেদিন জিদানের শৈল্পিক উত্তরাধিকার আর থিয়েরি অঁরির চিতা বাঘের মতো গতি! দুইয়ের এক অদ্ভুত রসায়ন তৈরি হলো কিলিয়ানের পায়ে।
ফুটবল যেমন দুহাত ভরে দেয়, তেমনি নির্মমভাবে কেড়েও নেয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় রাত। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কিলিয়ানের সেই অতিমানবীয় হ্যাটট্রিক! লুসাইল স্টেডিয়ামে একা এক ফরাসি বীর লড়াই করে গেলেন।
প্যারিস সেন্ট জার্মেইর চেনা আঙিনা ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সিতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুকে মাতানোর পর, এমবাপ্পে এখন আরও পরিপক্ক, আরও ক্ষুরধার। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ কিলিয়ানের জন্য কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি তার শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত সিলমোহর বসানোর মঞ্চ।

এবারের দিদিয়ে দেশমের ‘লে ব্লুজ’ দলের আর্মব্যান্ড তার হাতে। তিনি এখন সেনাপতি। ওলিজে, দুয়ে কিংব দেম্বেলেদের নিয়ে ফ্রান্স এখন এক অপ্রতিরোধ্য সেনাবহর।
মেটলাইফ স্টেডিয়াম কিংবা অ্যারলিংটনের সেমি-ফাইনাল, ফাইনালের মঞ্চগুলো অপেক্ষা করছে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা মেক্সিকোর মাটিতে নিজেকে অমর করেছিলেন, পেলে করেছিলেন ব্রাজিলের জার্সিতে। কিলিয়ান এমবাপ্পের সামনে সুযোগ নিজেকে ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় খোদাই করে নেওয়ার। বিশ্বকে জানানোর, আমি এই দিনেরে নিয়ে গেছি সেই দিনেরও কাছে।











