শোক জয়ী অপ্রতিরোধ্য সিরাজ

সিরাজ যখন টেনিস বলে গতির ঝড় তুলতেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এই ছেলেই একদিন বল হাতে বিশ্বসেরা ব্যাটারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেবেন। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তার কবজিতে ছিল আগুনের তেজ আর চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন।

গল্পটা শুরু হয়েছিল হায়দ্রাবাদের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা মোহাম্মদ গাউস ছিলেন একজন অটোচালক, যাঁর উপার্জনের প্রতিটি পয়সা ব্যয় হতো ছেলের ক্রিকেট কিট কিনতে। মোহাম্মদ সিরাজ যখন টেনিস বলে গতির ঝড় তুলতেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এই ছেলেই একদিন বল হাতে বিশ্বসেরা ব্যাটারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেবেন। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তার কবজিতে ছিল আগুনের তেজ আর চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন।

​সিরাজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট এবং একইসাথে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল ২০২০-২১ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর। সিডনি টেস্টের আগে যখন তার বাবা মারা যান, সিরাজ তখন কোয়ারেন্টাইনে। দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তিনি শেষবারের মতো বাবার মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারেননি। সেই শোককে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করলেন। ব্রিসবেনের গ্যাবায় যখন পাঁচ উইকেট নিয়ে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন তার দুচোখে ছিল অশ্রু আর আকাশের দিকে তোলা আঙুল। যেন বিদেহী বাবাকে বলছেন, ”আমি পেরেছি”।

বোলার সিরাজ মানেই এক অদ্ভুত ছন্দ। রান আপের শুরু থেকে বল রিলিজ পর্যন্ত তার মধ্যে এক ধরনের আদিম ক্ষুধা দেখা যায়। তার আউটসুইঙ্গারগুলো যখন ব্যাটারের অফ স্টাম্পের বাইরের বাতাস কেটে বেরিয়ে যায়, তখন যেন কোনো দক্ষ ভাস্কর তাঁর শৈল্পিক ছোঁয়া দেন।

এশিয়া কাপের ফাইনালে কলম্বোর মেঘলা দুপুরে শ্রীলঙ্কান ব্যাটাররা যখন খড়কুটোর মতো উড়ছিলেন, সিরাজ তখন যেন এক রুদ্রমূর্তির অবতার। ২১ রানে ছয় উইকেট – ওটা পরিসংখ্যান নয়, ওটা ছিল এক শিল্পীর প্রলয়নাচন। তিনি যখন বল করেন, মনে হয় বলটা তার কথা শোনে, তার ইশারায় ডানে-বামে বাঁক নেয়।

৪৫ টেস্টে ১৩৯ উইকেট, একদিনের ফরম্যাটে ৪৯ ইনিংসে ৭৬ উইকেট। আইপিএলে চিন্নাস্বামী মাতিয়ে এখন গুজরাটের জার্সি গায়ে আহমেদাবাদ। তার হাত থেকে বেরিয়ে আসা বলটা যেন কোনো অবাধ্য কিশোরী, যে শেষ মুহূর্তে দিক বদলে ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করতে ভালোবাসে।

মোহাম্মদ সিরাজের এ যাত্রা আমাদের শেখায় যে, ভাগ্য বলে কিছু নেই। যা আছে তা হলো কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য জেদ। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন যে, জীবনের পিচ যতই অমসৃণ হোক না কেন, যদি লক্ষ্য ঠিক থাকে সফলতা আসতে বাধ্য।

​আজ যখন সিরাজ লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাসেন কিংবা ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে নিজের নাম দেখেন, তখন আসলে জয় হয় সেই প্রতিটি বাবার যারা অভাবের মাঝেও সন্তানদের বড় স্বপ্ন দেখতে শেখান। সিরাজ কেবল একজন ক্রিকেটার নন।  তিনি এক জীবন্ত রূপক, এক অমর প্রেরণা।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link