ক্রিকেট মাঠে যখন চনমনে রোদ খেলা করে, তখন গ্যালারিতে বসে থাকা হাজারো দর্শক কেবল ব্যাটের ধার আর রানের গতি দেখেন। কিন্তু সেই ২২ গজের লড়াইয়ে কখনো কখনো ব্যাটের চেয়েও বেশি যুদ্ধ চলে ব্যাটসম্যানের অবচেতন মনে। প্রতিভা থাকলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে দৃঢ় না হলে, ব্যাট হাতে বোলারদের দাপিয়ে বেড়ানোটা দুষ্কর। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমনই এক বিস্ময়কর ও ট্র্যাজিক চরিত্রের নাম নাজিমউদ্দিন। যার ক্যারিয়ার মানেই – অসীম সম্ভাবনা আর তার সমান্তরালে হেঁটে চলা এক অজানা ভীতি।
২০০৭ সাল। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের শৈশবকাল তখন। কেনিয়ার বিপক্ষে অভিষেক আর পাকিস্তানের শোয়েব আখতার কিংবা মোহাম্মদ আসিফদের গতিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে নাজিমউদ্দিন খেলেছিলেন ৮১ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস। তখন পর্যন্ত ওটাই ছিল আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে কোনো ওপেনারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। ১৬ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রাখা ছেলেটির সামনে তখন দিগন্ত বিস্তৃত রাজপথ।
নাজিমউদ্দিনের ব্যাটে ছিল দানবীয় শক্তি, কিন্তু সেই শক্তির আড়ালেই ছিল এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা। পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও উঠে এসেছে এই বিচিত্র সত্য। তিনি নিজেই নিজের খেলা টিভিতে দেখতে কুঁকড়ে যেতেন, নার্ভাস হয়ে পড়তেন।

ডেল স্টেইন কিংবা মর্নি মরকেলের নাম শুনলেই যেন থমকে যেত তার স্বাভাবিক ছন্দ। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান পেসারদের মুখোমুখি হওয়ার কথা ভাবলেই এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করত তাকে। মাঠের ভেতরের লড়াইয়ের চেয়েও নিজের সাথে এই গোপন লড়াইটাই তাকে দিন দিন পিছিয়ে দিচ্ছিল।
ক্যারিয়ারের ঠিক বসন্তকালেই তিনি পা বাড়িয়েছিলেন নিষিদ্ধ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে (আইসিএল)। নিজের পায়ে যেন নিজেই কুড়াল মারলেন। যদিও বিসিবির অনুকম্পায় নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরেছিলেন দ্রুতই, কিন্তু ততদিনে ক্রিকেটের সময় ও স্রোত দুটোই অনেকটা এগিয়ে গেছে।
২০১১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে আবার আলোর মুখ দেখলেও, সেই পুরনো ছন্দ আর ফেরেনি। তিন টেস্টের মাত্র ২১ গড়ের পরিসংখ্যান কিংবা ১১ ওয়ানডের বিবর্ণ রেকর্ড তার অসীম প্রতিভার প্রতি বিন্দুমাত্র সুবিচার করেনি।

নাজিমউদ্দিনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ট্র্যাজিক দৃশ্য সম্ভবত ২০১২ সালের এশিয়া কাপ ফাইনাল। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ৫২ বল খেলে মাত্র ১৬ রানের এক অতি মন্থর ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। দিনশেষে বাংলাদেশ যখন মাত্র দুই রানের আক্ষেপে পুড়েছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুরো জাতির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
নাজিমউদ্দিন আমাদের মনে করিয়ে দেন, বড় খেলোয়াড় হওয়ার জন্য কেবল প্রতিভাশালী হাত থাকলেই হয় না, ইস্পাতকঠিন মনস্তত্ত্বও প্রয়োজন। তিনি রয়ে গেলেন এক অসমাপ্ত স্বপ্নের নাম হিসেবে। যার শুরুটা ছিল রূপকথার মতো, কিন্তু সমাপ্তিটা বড্ড বেশি ধূসর।










