নাজমুল হোসেন, যে গল্পটা লেখা হয়নি

ড্রেসিংরুমে সবাই তাঁকে বলত লাকি চার্ম। কিন্তু, নাজমুল হোসেনের ভাগ্য কি কখনো তার সহায় হয়েছিল? বারবার ফিরে এসেছেন ইনজুরি থেকৈ, তবু সবসময় থেকেছে ছায়ায়, আড়ালে। প্রতিভাবান এই ফাস্ট বোলারের ক্যারিয়ারটা শেষ হয়েছে শুধু আক্ষেপ আর অবহেলায়।

ড্রেসিংরুমে সবাই তাঁকে বলত লাকি চার্ম। কিন্তু, নাজমুল হোসেনের ভাগ্য কি কখনো তার সহায় হয়েছিল? বারবার ফিরে এসেছেন ইনজুরি থেকৈ, তবু সবসময় থেকেছে ছায়ায়, আড়ালে। প্রতিভাবান এই ফাস্ট বোলারের ক্যারিয়ারটা শেষ হয়েছে শুধু আক্ষেপ আর অবহেলায়।

১৬ জানুয়ারি, ২০০৯। মিরপুরের আকাশজুড়ে ঝলমলে রোদ। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে মুখোমুখি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। শক্তিশালী লঙ্কানদের জন্য ১৫৩ রান—এ যেন শিশুর খেলনা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো সহজ টার্গেট। কিন্তু সেদিন কিছু একটা বদলে গিয়েছিল।

লঙ্কান ইনিংসের সূচনা হলো, আর মুহূর্তেই যেন ঝড় উঠল মিরপুরে। ৬ রানের মাথায় ৫ উইকেট নেই! অবিশ্বাস্য! এক টুকরো স্বপ্নের মতো মুহূর্ত। মাঠের বাইরে টেনশন চিবোতে থাকা বাংলাদেশি সমর্থকরা দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন। স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে দিচ্ছে ‘বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!’ গর্জন।

আর এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্য নায়ক ছিলেন নাজমুল হোসেন।  একজন ‘অপ্রয়োজনীয়’ ক্রিকেটার। একাদশে সুযোগ পাওয়ার আগেও যাঁকে শুনতে হয়েছিল, ‘খারাপ করলেই আর কখনো দলে সুযোগ পাবে না!’ কোচ জেমি সিডন্সের সেই কথা আজও কানের মধ্যে বাজে নাজমুলের।

কী অদ্ভুত! যাঁর প্রতি এতটুকু আস্থা ছিল না কোচের, সেই ছেলেটাই সেদিন স্বপ্ন দেখিয়েছিল গোটা দেশকে। গল্পের শুরু আরও আগে – ১৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক অভিষেক। ২০০৫ সালে ঐতিহাসিক কার্ডিফের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর নায়কেদের একজন ছিলেন তিনিও। ম্যাথু হেইডেনকে বোল্ড করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর?

এরপর এক দীর্ঘ অপেক্ষা। ইনজুরি তাঁকে শুইয়ে দিল হাসপাতালের বিছানায়। ফিরে এলেন। কিন্তু জাতীয় দলে জায়গা পেলেন না। ব্যাটসম্যানরা “হেঁটে হেঁটে পিটাবে”—এমন অবজ্ঞার শিকার হতে হলো তাঁকে। তবু তিনি হাল ছাড়লেন না। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। ৩৮ ওয়ানডেতে মাত্র ৫ ইকোনমিতে ৪৪ উইকেট—কিন্তু তবু তিনি উপেক্ষিত!

২০১২ সালের এশিয়া কাপ ফাইনাল ছিল তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বাংলাদেশ হেরেছিল মাত্র ১ রানে। আর নাজমুল? সেদিনও ছিলেন নি:শব্দ সৈনিক, ৮ ওভারে ৩৬ রান দিয়ে এক উইকেট নিয়েছিলেন। এরপর? এরপর আর ডাক আসেনি জাতীয় দল থেকে।

সময় গড়ায়, দলে আসা-যাওয়ার মিছিল চলে। কিন্তু নাজমুল? স্কোয়াডে থেকেও একাদশে জায়গা পান না, একাদশে থেকেও বল করার সুযোগ পান না! জাতীয় লিগে ৪০ জনের স্কোয়াডে থেকেও নিজের নাম দেখেন না!

২৮ বছর বয়সে ক্ষোভে-হতাশায় ক্রিকেট ছেড়ে পাড়ি জমান বিদেশে। তবে, মাতৃভূমির মায়া ভুলতে পারেননি। তিন বছর পর ফিরে এসে মাত্র ৩১ বছর বয়সে বিদায় নেন প্রিয় খেলাটির কাছ থেকে। এখন তিনি কোচিংয়ে মন দিয়েছেন, একালের কিশোর ক্রিকেট প্রেমীরা হয়তো জানেননি না সেদিন কি অবলীলায় তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছেন সাঙ্গাকারা-মাহেলাদের।

তবে আজও যখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের হারিয়ে যাওয়া নায়কদের নাম উঠে আসে, তখন কেউ না কেউ ফিসফিসিয়ে বলেন—নাজমুল হোসেন! যে গল্পটা লেখা হয়নি, যে নায়কের জন্য কোনো সংবর্ধনা ছিল না, যিনি নিজে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না রেখেই দলকে দিয়ে গিয়েছিলেন নিজের সর্বস্ব!

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link