পরাজিত পিচের অদম্য সম্রাট

যখন রোদের তেজ মরে আসত, যখন ক্লান্ত বোলাররা ড্রেসিংরুমের শীতল ছায়ার দিকে আড়চোখে তাকাতেন - ঠিক তখনই তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে দৌড়ে আসতেন একজন। তার হাতে কোনো মায়াবী জাদুর কাঠি ছিল না, ছিল কেবল লাল রঙের এক গোলক আর শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা এক আদিম জেদ।

ক্রিকেট যদি হয় কোনো শান্ত সরোবর, তবে নিল ওয়াগনার ছিলেন সেখানে এক অশান্ত জলপ্রপাত। যখন রোদের তেজ মরে আসত, যখন ক্লান্ত বোলাররা ড্রেসিংরুমের শীতল ছায়ার দিকে আড়চোখে তাকাতেন – ঠিক তখনই তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে দৌড়ে আসতেন একজন। তার হাতে কোনো মায়াবী জাদুর কাঠি ছিল না, ছিল কেবল লাল রঙের এক গোলক আর শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা এক আদিম জেদ।

ওয়াগনারের জন্ম ১৯৮৬ সালের ১৩ মার্চ, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। শৈশব আর কৈশোরের স্বপ্নগুলো ডানা মেলেছিল প্রোটিয়া জার্সিকে ঘিরেই। ২০০৫ সালে নর্দানসের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে হাতেখড়ি। দক্ষিণ আফ্রিকার একাডেমি দলের হয়ে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে সফরেও গিয়েছেন। এমনকি দুই বার মূল টেস্ট দলের দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ পেলেও, ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি।

সেই আক্ষেপ আর নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে ২০০৮ সালে ঘরোয়া ক্রিকেট ছেড়ে পাড়ি জমান নিউজিল্যান্ডের দুর্গম পথে। সেখানেই শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম। ২০০৯ সালে কিউইদের ইমার্জিং দলে জায়গা করে নিয়ে জানান দেন নিজের আগমনী বার্তা। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর ২০১২ সালে যখন ব্ল্যাকক্যাপসদের হয়ে তার অভিষেক হলো, বিশ্ব দেখল এক ভিন্ন ঘরানার বোলারকে।

ওয়াগনারের বোলিং ছিল এক অদ্ভুত ম্যারাথন। যখন পিচ থেকে প্রাণ হারিয়ে যেত, যখন ব্যাটসম্যানরা থিতু হয়ে যেতেন, তখনই কেন উইলিয়ামসন বল তুলে দিতেন তার হাতে। শুরু হতো ওয়াগনারের সেই ‘বডিলাইন’ আক্রমণ। পপিং ক্রিজের একটু সামনে বল ফেলে ক্রমাগত ব্যাটসম্যানের বুক বরাবর শর্ট পিচ বল করে যাওয়া। এক ওভার নয়, দুই ওভার নয়, স্পেলের পর স্পেল।

ব্যাটসম্যানরা ক্লান্ত হতেন, বিরক্ত হতেন, কিন্তু ওয়াগনার হতেন না। তিনি যেন গ্রিক মিথোলজির সেই ‘সিসিফাস’, যিনি বারবার পাহাড়ের চূড়ায় পাথর তুলতেন, যতক্ষণ না ব্যাটসম্যান ভুল করে ক্যাচ তুলে দিচ্ছেন।

মাউন্ট মঙ্গানুইতে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই টেস্টের কথা কি ভোলা যায়? পায়ের আঙুলে ফ্র্যাকচার নিয়ে তিনি বোলিং করে যাচ্ছিলেন। চিকিৎসকরা অবাক, সতীর্থরা বিমূঢ়। কিন্তু ওয়াগনারের ডিকশনারিতে ‘ব্যথা’ শব্দটি ছিল না। তিনি জানতেন, তার দলের তাকে প্রয়োজন। সেই ভাঙা পা নিয়েই তিনি উইকেট নিলেন, দলকে জেতালেন।

৬৪ টেস্টে ২৬০ উইকেট। সংখ্যাটা হয়তো কিংবদন্তি তূল্য নয়। কিন্তু এই ২৬০ উইকেটের প্রতিটি ছিল হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল। তিনি ছিলেন সেই কারিগর, যিনি নিজে উত্তাপ সহ্য করে অন্যদের জন্য রাস্তা তৈরি করে দিতেন। ২০২১ সালে নিউজিল্যান্ডের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পেছনে তার সেই নিঃশব্দ অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে যখন তিনি চোখের জলে বিদায় জানালেন, তখন বোঝা গেল ক্রিকেট আসলে কেবল পরিসংখ্যান নয়, আবেগেরও। ওয়াগনারের বিদায় মানে হলো নিউজিল্যান্ডের বোলিং আক্রমণ থেকে এক অদ্ভুত জেদের প্রস্থান। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা সীমিত থাকলেও কেবল সাহসের জোরে বিশ্বজয় করা সম্ভব।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

ত্রিদেশীয় সিরিজে তুরুপের তাস কারা?

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে হাসান মাহমুদের প্রত্যাবর্তন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে চলেছেন হাসান! লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর বোলিংয়ের ধার এবার সাদা বলেও দেখতে চাইবে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা। গতি, নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ আর ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করার দক্ষতা তাঁকে করে তুলতে পারে পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা হতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ। টেস্টের আত্মবিশ্বাস ওয়ানডেতেও অনূদিত হলে হাসানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বোলিংয়ে যোগ করতে পারে বাড়তি ধার। তবে একাদশে সরাসরি জায়গা পাবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়ের জায়গা।

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

Share via
Copy link