জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে বেঁচে থাকা এক অলৌকিক ব্যাপার। তবে তাঁর চেয়ে অলৌকিক ব্যাপার এই যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝে নিজের জীবনকে রঙিন করে তোলা। সবাই পারে না, কেউ ঝরে পড়ে, কেউ হারিয়ে যায় ক্ষুধার তাড়নায়, কেউ বেঁচে থাকে স্রেফ বাঁচতে হবে তাই। সবাই ভাগ্যকে মেনে নেয়, তবে কেউ নিয়ন্ত্রণ করার দুঃসাহসটা দেখায় না। এটার জন্য বিনয় লাগে, পরিশ্রম লাগে, পেটে ক্ষুধা নিয়েও মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখার মতো দুঃসাধ্য কাজ করা লাগে। এসব সবাই পারে না, সবাই তো আর এনগোলো কান্তে না।
ফ্রান্সের সেন্ট ডেনিসে আলো ঝলমলে এক রাত। বিশ্বকাপ ফাইনাল, ১৯৯৮। স্বপ্নের শিরোপা ছোঁয়ার লড়াইয়ে মুখোমুখি ব্রাজিল ও ফ্রান্স। গ্যালারিতে ঢেউ খেলছে উল্লাস, ফুটবল জাদুতে মগ্ন পুরো পৃথিবী। আর ঠিক সেই সময়, সেই উন্মাদনার মাঝেই এক কোণে মাথা নিচু করে নিজের কাজে ব্যস্ত একটি ছোট্ট ছেলে।
তার চোখ মাঠে নয়, গোলপোস্টে নয়, জিদানের পায়ে নয়। তার চোখ পড়ে আছে গ্যালারির ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল, বিয়ার ক্যানের দিকে। একে একে সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে, যত্ন করে ভরছে নিজের থলেতে।
ফুটবল উৎসব তার কাছে তখন জীবনের গল্প নয়, জীবিকা। যত বেশি কুড়িয়ে নিতে পারবে, তত বেশি টাকা। সেই টাকা দিয়েই চলবে সংসার। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানো কান্তের কাঁধে তখন দায়িত্বের বোঝা। দিনশেষে সেই কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস বিক্রি করে যা আয় হতো, তা তুলে দিত মায়ের হাতে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী মা আর চার ভাইবোন, এই ছিল তার পৃথিবী।

এদিকে মাঠে ইতিহাস লিখছে ফ্রান্স। ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসছে পুরো দেশ। শুরু হচ্ছে ফরাসি ফুটবলের নতুন যুগ। কিন্তু সেই গল্পের বাইরে, এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজের লড়াই লড়ে যাচ্ছিল যে ছেলেটি, তার গল্প তখনও লেখা বাকি।
সময় গড়িয়েছে। কুড়িয়ে নেওয়া বোতলের জায়গা নিয়েছে ফুটবল। সংগ্রামের গল্প বদলে গেছে স্বপ্নপূরণের কাব্যে। সেই ছোট্ট কান্তেই একদিন জায়গা করে নিয়েছেন ফ্রান্স জাতীয় দলে। হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার।
২০১৮, ঠিক ২০ বছর পর। আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্স। এবার গ্যালারিতে নয়, মাঠের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন কান্তে। বুক চিতিয়ে লড়ছেন দেশের জন্য। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যেন একাই আটকে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসিকে! নিজেকে রীতিমতো মেশিন বানিয়ে ফেলেছিলেন।
শেষমেশ ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ফ্রান্স। আর সেই সোনালি ট্রফি জয়ের পথে অন্যতম নায়ক, এই এনগোলো কান্তে।

ক্লাব ফুটবলেও গল্পটা কম রঙিন নয়। চেলসির জার্সিতে তিনি জিতেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ—একটির পর একটি শিরোপা। অথচ এই সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও মানুষটা একই রকম বিনয়ী, শান্ত, অমায়িক।
‘পৃথিবীর ৭০ শতাংশ পানি, বাকি ৩০ শতাংশ কান্তে!’ কারণ মাঠে তিনি যেন সর্বত্র উপস্থিত। প্রতিটি ইঞ্চি ঘাসে ছুটে বেড়ানো এই মিডফিল্ডার আসলে শুধু একজন ফুটবলার নন, এক জীবন্ত প্রেরণা।একসময় যে ছেলে বিশ্বকাপের গ্যালারিতে ময়লা কুড়িয়ে বেড়াত, ঠিক ২০ বছর পর সেই একই বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রফি জিতে নেন তিনি।
জীবন কাকে কখন কোথায় নিয়ে যায় কেউ জানে না। এমন কথা প্রচলিত আছে আমাদের মাঝে। তবে সত্যটা হলো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানতে হয়, ভাগ্যর উপর ভরসা করে বসে থাকলেও প্রাপ্তির খাতা শূন্যই থাকে। কান্তের মতো ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই জীবনের স্বার্থকতা।











