বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) মঞ্চেই অনেকেই নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন, কেউ পেয়েছেন জাতীয় দলের ডাক, কেউ আবার রাতারাতি হয়ে উঠেছেন আলোচনার কেন্দ্রে। ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রতিভা তুলে আনা, আর সেই জায়গায় বিপিএল বারবার প্রমাণ দিয়েছে তার গুরুত্ব।
তবে বাস্তবতা হলো, এই আলো অনেক সময়ই ক্ষণস্থায়ী। অনেক ক্রিকেটার এক–দুটি আসরে ঝলসে উঠলেও, পরের বছরগুলোতে হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অতলে। আজকের গল্পটা ঠিক সেইসব ‘এক আসরের বিস্ময়’দের নিয়েই।
২০১৫–১৬ বিপিএলের কথা উঠলেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স আর আসহার জাইদির নাম আলাদা করে মনে পড়ে। ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী পাকিস্তানি এই অলরাউন্ডার যেন এক মৌসুমেই লিখে ফেলেছিলেন নিজের পুরো গল্প। ব্যাটিং, বোলিং আর ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই ছিলেন দুর্দান্ত। কুমিল্লার শিরোপা জয়ের পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

সেই আসরে আট ইনিংসে ব্যাট করে ৫৩.৭৫ গড়ে ২১৫ রান, সঙ্গে বল হাতে ১৭ উইকেট—এমন পারফরম্যান্স তাঁকে এনে দিয়েছিল টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার। দর্শকদের চোখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিখুঁত টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার।
কিন্তু, ক্রিকেট বড়ই নিষ্ঠুর। পরের মৌসুমে মাত্র তিন ম্যাচে ব্যাটে ২৯ রান, উইকেটশূন্য বোলিং—সব মিলিয়ে রং ফিকে হয়ে যায়। ২০১৬ সালের পর বিপিএলে আর দেখা মেলেনি আসহার জাইদির। এক আসরেই এসেছিলেন, ঝড় তুলেছিলেন, ট্রফি জিতেছিলেন, তারপর হারিয়ে গেছেন—একেবারে ‘ওয়ান সিজন ওয়ান্ডার’।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আগ্রাসী ওপেনারের অভাব দীর্ঘদিনের। সেই শূন্যতা পূরণের আশায় ২০২২ বিপিএলে আবির্ভাব ঘটে মুনিম শাহরিয়ারের। ফরচুন বরিশালের জার্সিতে, সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে খেলতে গিয়ে সুযোগ পেয়েছিলেন নিজেকে মেলে ধরার। ভয়ডরহীন ব্যাটিং, শুরু থেকেই আক্রমণ—মুনিম যেন হঠাৎ করেই বদলে দিয়েছিলেন পরিচিত ছবিটা।

তার সেই ঝলকানিতে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলাতে গিয়ে খেই হারান তিনি। আত্মবিশ্বাসী মুনিম বদলে যান দ্বিধাগ্রস্ত ব্যাটারে। দ্রুতই ছিটকে পড়েন জাতীয় দল থেকে। ২০২৩ বিপিএলেও আর দেখা যায়নি সেই বিধ্বংসী রূপ। এক মৌসুমের আলো জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে আড়ালেই চলে যান মুনিম শাহরিয়ার।
২০১৬ বিপিএলে ঢাকা ডাইনামাইটসের হয়ে একঝাঁক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিলেন মেহেদী মারুফ। শিরোপা জয়ের পথে দলগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি যে একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ঝলক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তারই উদাহরণ ছিলেন তিনি। মারকাটারি ব্যাটিংয়ে একের পর এক ম্যাচে ঢাকাকে টেনে তুলেছিলেন সামনে।
পুরো টুর্নামেন্টে ১৩৬ স্ট্রাইক রেটে রান করে, নিজের উপরে থাকা সব ব্যাটারের চেয়ে দ্রুতগতির রান সংগ্রাহক ছিলেন মারুফ। কিন্তু সেই আসরই যেন তাঁর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখর। পরের বছরগুলোতে আর ফিরতে পারেননি সেই ছন্দে। বিপিএলের মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান তিনিও।

এই তালিকায় আরেকটি নাম—আরিফুল হক। ২০১৭–১৮ মৌসুমে খুলনা টাইটানসের হয়ে লোয়ার অর্ডারে তাঁর কার্যকর ব্যাটিং নজর কেড়েছিল অনেকের। ১৩৫ স্ট্রাইক রেটে দ্রুত রান তোলার দক্ষতা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল জাতীয় টি-টোয়েন্টি দলে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে থিতু হওয়া হয়নি। পরবর্তী বিপিএলগুলোতেও আর তেমন আলো ছড়াতে পারেননি তিনি।
বিপিএল তাই একদিকে যেমন স্বপ্ন দেখায়, তেমনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখিও দাঁড় করায়। এখানে এক মৌসুমে নায়ক হওয়া যায়, আবার পরের মৌসুমেই হারিয়ে যাওয়া যায় অন্ধকারে। আসহার জাইদি, মুনিম শাহরিয়ার, মেহেদী মারুফ কিংবা আরিফুল হক—তাঁদের গল্পগুলো সেই সত্যটাই মনে করিয়ে দেয়। বিপিএল সুযোগ দেয়, কিন্তু সেই সুযোগ ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।











