রবীন্দ্রনাথ ও ক্রিকেট

অযথা না ফেনিয়ে প্রথমেই আশ্বস্ত করছি, রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেট খেলতেন।

১৯৬২ সালের ৩ রা জানুয়ারি আনন্দবাজারে জগদীশচন্দ্র রায়ের লেখা চিঠি এর সবথেকে বড় প্রমাণ। চিঠিটার একটা অংশ শঙ্করীপ্রসাদ বসু ‘সারাদিনের খেলা’য় উদ্ধৃত করেছেন। আমি সেটা হুবহু টাইপ করে দিচ্ছি।

‘১৯নং স্টোর রোডে (বালীগঞ্জ) স্বর্গীয় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় থাকতেন। তিনি তাঁর পেনসনের সমস্ত টাকাটাই দেশের জন্য খরচ করতেন। বিশেষ করে পালোয়ানদের ও লাঠিয়ালদের মাহিনা দিয়ে দক্ষিণ কলকাতার ছোট-ছোট ছেলেদের সংগঠন [sic?] ও শক্তিশালী করতেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো থেকে সপ্তাহে তিন দিন নিয়মিত এসে খেলায় যোগ দিতেন।

১৯নং স্টোর রোডের সামনেই মিলিটারী মাঠ; সেই মাঠের একপাশে তখনকার দিনের ভারত-বিখ্যাত সাহেবদের ক্রিকেট-ক্লাব। ঐ ক্লাবে ভারতীয়দের সভ্য হবার কোন উপায় ছিল না, তাঁরা যতই বড় হউন না কেন।

কোনো একদিন ঐ ক্লাবের ক্রিকেট-খেলা দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মেজদাদাকে বলেন। সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ম্যানেজার মিঃ ভোগেল এবং আমাকে ব্যাট, বল, নেট প্রভৃতি কিনতে পাঠিয়েছিলেন। ঐ সঙ্গে বলে দেন – ভারতীয় দোকান থেকে জিনিস কিনতে। আমরা এস্‌প্ল্যানেডের উত্তর দিকের দোকান থেকে সমস্ত জিনিস কিনে ফিরি। তার পরদিন থেকেই খেলা আরম্ভ হয়। সত্যেন্দ্রনাথ দুই জন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানকে মাইনে দিয়ে খেলা শিখাবার জন্য নিযুক্ত করলেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো থেকে প্রত্যহই খেলা দেখতে ও খেলতে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের এই খেলা কিন্তু মোটেই ভাল লাগেনি। তার কারণ একদিন খেলতে-খেলতে একটা বল তাঁর পায়ে লাগে এবং তিনি জখম হন। তাছাড়া ক্রিকেট খেলার যা বিশেষ দরকার, তা তাঁর ছিল না। অর্থাৎ তিনি তাঁর মন ও চোখ ঠিক রাখতে পারতেন না। প্রায় তিন মাস পরে ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় খেলা লাঠি নিয়ে থাকতেন। তাঁর দাদা অবশ্য বৃদ্ধ বয়সেও ক্রিকেট খেলতেন।”

কাজেই তিনি যে খেলতেন, তা নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই, তবে এটা ঠিক কবে সে ব্যাপারে সঠিক কিছু জানা যায়নি।

পায়ের চোটটা কতটা সিরিয়াস সে ব্যাপারে ইতিহাস মোটামুটি নীরব। আশাকরি আলখাল্লাটা চোট লুকোনোর জন্য পরা শুরু করেননি।

তবে জগদীশবাবুর লেখা পড়ে মনে হয় যে চোটটা গৌণ কারণ। ক্রিকেট যে কেবলই যাতনাময় হতে পারেনা সেটা উনি নির্ঘাত বুঝেছিলেন। বাহির-পানে চোখ মেলা আর পোষাচ্ছিল না সম্ভবতঃ।

দেখাই যাচ্ছে যে বিশেষ সুবিধে করে উঠতে পারেননি, অবশ্য পারলেও বেশিদূর এগোতে পারতেন না। ক্রিকেটের চর্চা রায়বাড়িতে হত, ঠাকুরবাড়িতে নয়।

যা হয়েছে ভালই হয়েছে। এতটাই এন্টারপ্রাইজিং যে ক্রিকেটটা সিরিয়সলি নিলে নির্ঘাত কিছু একটা করে বসতেন। আইপিএলে হয়ত দলের নাম হত কলকাতা আরএনটিজ।

ভাগ্যিস খেলেননি। অতগুলো মণিহার একসঙ্গে ম্যানেজ করতে পারতেন না।

আর কিছু না হোক, বর্ষার গানগুলো যে লিখতেন না সেটা জোর দিয়েই বলা যায়।

__________

খেলা ছাড়লেও আদৌ খবর রাখতেন কি ক্রিকেটের? পড়তেন? ভাবতেন? আকাশে পাতিয়া কান খোঁজ নিতেন কী হচ্ছে না হচ্ছেন? নাকি নীল পদ্মের মতই নিভৃতে থেকে যেত ক্রিকেট?

ক্রিকেট নিয়ে কয়েকটা লেখা লিখলে পারতেন অবশ্য। ব্র্যাডম্যানকে আদৌ পছন্দ করতেন বলে মনে হয় না, মহাপঞ্চক গোছের কিছু বলে বসতেন হয়ত। বা হয়ত ‘বোঝা তোর ভারী হলে ডুববে তরীখান’ গোছের কিছু গেয়ে উঠতেন।

না না, রবীন্দ্রনাথ লিখলে ট্রাম্পার বা রণজিকে নিয়েই লিখতেন।

দু’টো ঘটনা এখানে বলা আবশ্যক। বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য’ একবার একটা সভার আয়োজন করেন। সেটা বৈশাখ ১৩১২। অর্থাৎ এপ্রিল বা মে ১৯০৫।

বক্তৃতা দিতে এসে রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বললেন

‘আজ সাহিত্য-পরিষৎ আমাদিগকে যেখানে আহ্বান করিয়াছেন তাহা কলেজ-ক্লাস হইতে দূরে, তাহা ক্রিকেট-ময়দানেরও সীমান্তরে, সেখানে আমাদের দরিদ্র জননীর সন্ধ্যাবেলাকার মাটির প্রদীপটি জ্বলিতেছে।’

সে বললেন বেশ করলেন, এটা তেমন মারাত্মক কিছু নয়। কিন্তু আসল বোমাটা তিনি এই বক্তৃতায় ইতিমধ্যেই ফেলে বসে আছেন, এর ঠিক আগে:

‘দিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও নাহয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম। তার পরে?’

আপাত:দৃষ্টিতে এটা মারাত্মক কিছু মনে না হলেও একটা চিন্তা মাথায় ঢুকেই গেল। রণজিৎ মানে নেহাৎই যুদ্ধে (ক্রিকেট ম্যাচে) জয়ী? নাকি রণজিৎসিংজি?

আগেই বলেছি, এটা ১৯০৫। তার আগের ছ’বছরে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে রীতিমত অগ্নিকাণ্ড ঘটাচ্ছেন রনজি। হোভে ঈস্টবোর্নে হেস্টিংসে শুধু নয়, লর্ডসে ওভালেও ব্যাট হাতে ভৈরব হরষে রান করে চলেছেন। এর মধ্যে চার বছর সাসেক্সের অধিনায়কও ছিলেন তিনি। ১৯০২-এ গড় সামান্য নামলেও সে তেমন কিছু নয়।

বক্তৃতার আগের বছর, অর্থাৎ ১৯০৪-এ, দশ সপ্তাহের একটা অধ্যায়ে তিনি আটটা সেঞ্চুরি, পাঁচটা পঞ্চাশ করেছিলেন।

তারপর প্রায় চার বছর ভারতে ছিলেন রনজি। ১৯০৫ সালের মে মাসে (অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার সময়েই) মনসুর খচর বম্বে হাইকোর্টে রনজির নামে কেস করেন, তবে সে অন্য গল্প। তবে মামলা-মোকদ্দমার ঠেলায় গোটা বছরটাই রঞ্জিকে দেশে কাটাতে হয়।

সন্দেহটা ঘনীভূত হওয়ার আরেকটা কারণ হল যে রবীন্দ্রনাথ রনজির ব্যাপারে বিলক্ষণ জানতেন। চৈত্র ১৩০৮এ (অর্থাৎ মার্চ বা এপ্রিল ১৯০২) একটা প্রবন্ধ (সম্ভবতঃ) লিখেছিলেন, নাম “বারোয়ারি-মঙ্গল”। সেখানে লিখেছেন ‘রামমোহন রায় আজ যদি ইংলণ্ডে যাইতেন তবে তাঁহার গৌরব ক্রিকেট-খেলোয়াড় রঞ্জিতসিংহের গৌরবের কাছে খর্ব হইয়া থাকিত।’

১৯০০ আর ১৯০১ রনজির স্বর্ণযুগেও একেবারে চব্বিশ ক্যারাট।

__________

কিন্তু এ তো গেল রনজি নিয়ে বক্তৃতা প্রবন্ধ। মেনস্ট্রিমে ক্রিকেট কি একেবারেই নেই? “চিরকুমার সভা”র দ্বিতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে শ্রীশ দিব্যি বলছে: ‘তোমরা যে দিনরাত্রি ফুটবল টেনিস ক্রিকেট নিয়ে থাক, তোমরা একবার পড়লে ব্যাট্‌বল গুলিডাণ্ডা সবসুদ্ধ ঘাড়-মোড় ভেঙে পড়বে।’

ব্যাটবলের প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে ‘গোরা’ থেকে কয়েকটা উদ্ধৃতি দিই:

‘এখানকার মেলা উপলক্ষেই কলিকাতার একদল ছাত্রের সহিত এখানকার স্থানীয় ছাত্রদলের ক্রিকেট-যুদ্ধ স্থির হইয়াছে। হাত পাকাইবার জন্য কলিকাতার ছেলেরা আপন দলের মধ্যেই খেলিতেছিল। ক্রিকেটের গোলা লাগিয়া একটি ছেলের পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে।’

সর্বনাশ, আবার পায়ে চোট কেন? আত্মকথা লিখছিলেন নাকি? আর এতদিন ‘বল’ ‘বল’ লিখে হঠাৎ ১৯১০-এ এসে ‘গোলা’ কেন?

পরে আবার ‘ছাত্ররা গোরাকে চিনিত – গোরা তাহাদিগকে লইয়া অনেকদিন ক্রিকেট খেলাইয়াছে।’

এসবের বেশ কিছু পাতা আগে ‘ধাপার মাঠে শিকারির দলে নন্দর মতো অব্যর্থ বন্দুকের লক্ষ কাহারো ছিল না। ক্রিকেট খেলায় গোলা ছুঁড়িতেও সে অদ্বিতীয় ছিল। গোরা তাহার শিকার ও ক্রিকেটের দলে ভদ্র ছাত্রদের সঙ্গে এই-সকল ছুতার-কামারের ছেলেদের একসঙ্গে মিলাইয়া লইয়াছিল।’

__________

‘ইংরাজি সহজশিক্ষা’র Chapter 38এ ‘for’ শেখাতে গিয়ে ‘the potter makes a cup for his father’ জাতীয় কয়েকটা একই ধরনের বাক্য ব্যবহার করেছেন। এরই একটা হল ‘the boy takes his bat for a game’.

মজার ব্যাপার, এই ব্যাটবাহক বালক ছাড়া চ্যাপ্টারে বাকি সবাই হয় কাজ বা পড়াশুনো করছে। এরই শুধু অখণ্ড অবসর।

__________

এই অদ্ভুত বিষয়ে লেখা শুরু করার কারণটা আগে বলি। আমি রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা অখ্যাত লেখা  পড়ছিলাম। অখ্যাত মানে আমার কাছে অচেনা, আমি নিশ্চিত যে অনেকেই বলে দেবে কোন্‌ লেখাটা কী খেয়ে কোথায় বসে কোন্‌ কলমে লেখা। তখনই ‘নারীপ্রগতি’ কবিতাটা পড়তে পড়তে হকচকিয়ে যাই, বিশেষ করে এই লাইনগুলো:

তোমাদের গজগামিনীর দিনে

কবিকল্পনা নেয় নি তো চিনে;

কেনে নি ইস্‌টিশনের টিকেট;

হৃদয়ক্ষেত্রে খেলে নি ক্রিকেট;

চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলায় –

তারা তো মন্দ-মধুর দোলায়

শান্ত মিলন-বিরহ-বন্ধে

বেঁধেছিল মন শিথিল ছন্দে।

‘চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলা’ মনে হয় না আর কেউ কখনও ব্যবহার করেছেন।

__________

ব্যাটবলের ব্যাপারে বলব বলেছিলাম। সহজ পাঠের দ্বিতীয় ভাগের দ্বিতীয় ভাগে যেখানে য্‌-ফলা শেখানো হচ্ছে, সেখানে আছে “অগত্যা বাইরে ব’সে আছি। দেখছি, ছেলেরা খুশি হয়ে নৃত্য করছে। কেউ বা ব্যাটবল খেলছে। নিত্যশরণ ওদের ক্যাপ‍্টেন।”

এই ‘ব্যাটবল’ কি ক্রিকেট? ‘ক্যাপ্‌টেন’ আছে যখন, ক্রিকেট হতেই পারে (জানি, অত্যন্ত বাজে যুক্তি), কিন্তু একটা খটকা থেকেই যায়। ‘ছেলেবেলা’য় স্পষ্ট লেখা আছে: ‘তখন খেলা ছিল সামান্য কয়েক রকমের। ছিল মার্বেল, ছিল যাকে বলে ব্যাটবল – ক্রিকেটের অত্যন্ত দূর কুটুম্ব। আর ছিল লাঠিম-ঘোরানো, ঘুড়ি-ওড়ানো। শহরে ছেলেদের খেলা সবই ছিল এমনি কম্‌জোরি। মাঠজোড়া ফুটবল-খেলার লম্ফঝম্ফ তখনো ছিল সমুদ্রপারে।’

এটা খুব অস্বস্তিকর। মাঠের অভাবে ফুটবল হত না, তাই ক্রিকেট হওয়ার প্রশ্নই উঠছে না। ডাংগুলিও নয়, কারণ আমরা আগেই শ্রীশকে ‘ব্যাটবল’ আর ‘গুলিডাণ্ডা’ আলাদাভাবে বলতে দেখেছি। কাজেই ডাংগুলির ডাণ্ডা আর গুলিকে আদৌ ব্যাট-বল বলা হত না।

ব্যাটবলের কথা ‘যোগাযোগ’এও ছিল: ‘বিপ্রদাস বাল্যকালে যে ইস্কুলে পড়ত সেই ইস্কুলেরই সংলগ্ন একটা ঘরে বৈকুণ্ঠ ইস্কুলের বই খাতা কলম ছুরি ব্যাটবল লাঠিম আর তারই সঙ্গে মোড়কে-করা চীনাবাদাম বিক্রি করত।’

ব্যাট আর বল এত সহজলভ্য ছিল তখন যে বাদামের সঙ্গে একই দোকানে পাওয়া যেত? নাকি এই ব্যাটবল ক্রিকেটের ব্যাট আর বল নয়, সেই রহস্যময় ‘ব্যাটবল’ খেলার ব্যাট আর বল?

হয়ত। হয়ত নয়। অত না জানলেও চলবে। ক্রিকেট খেলতেন, জানতেন, বুঝতেন, এতেই আমি ধন্য। দু’-একটা খটকা থাক। মাঝে মাঝে তার ছিঁড়তেই পারে, তাতে অত হাহাকার করার কিছু নেই।

__________

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেটেও আছেন!

প্রশ্নটি যে কেবল বোরিয়া মজুমদারের বিলেতি বন্ধুর মনেই উঁকি দিয়েছিল, এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই। জিজ্ঞাস্যটি আপনারও। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ প্রেম থেকে জরা-শীর্ণ বৃদ্ধের আকুতি, বাঙালির জীবন আবর্তিত তো বিশ্বকবির বৃত্তেই। জীবনের বিচিত্রতম সব অনুভূতিতেই রবীন্দ্রনাথকে পাশে পেয়ে আপনার জানতে চাওয়াটা স্বাভাবিক, ‘আচ্ছা, রবি ঠাকুরের হাত পড়েনি, এমন কি কোনো জায়গা আছে?’ যেমনটি মজুমদারের বন্ধু চেয়েছিলেন।

এমন প্রশ্নে মজুমদার মৌনই ছিলেন। পাশ থেকে বরং মজুমদারের অন্য এক বাঙালি বন্ধু উত্তর করেছিলেন, ক্রিকেট নিয়ে সম্ভবত রবি ঠাকুর কিছু করেননি। বই-পত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করে সেই সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে বোরিয়া মজুমদার আবিষ্কার করেছিলেন, কবিগুরুর ছোঁয়া ক্রিকেটেও লেগেছিল।

প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে, আমাদের রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেটেও আছেন।

_______________

প্রথমে পরোক্ষ যোগাযোগের গল্পটিই সারা যাক। ক্রিকেটের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দূরসম্পর্কের যোগাযোগ ঘটেছিল ব্রজরঞ্জন রায়ের সৌজন্যে। বাংলায় ক্রিকেট নিয়ে লেখালেখিটা শুরু করেছিলেন এই ব্রজরঞ্জন রায়ই। আর লিখতে গিয়েই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, ক্রিকেট নিয়ে লিখতে গেলে বেশ কিছু শব্দ একদম অত্যাবশকীয় হয়ে পড়ে, ইংরেজিতে লিখলে তা বোঝাও যায় ভালো, অথচ তা ঠিক-ঠিক বোঝায় এমন কোনো শব্দ বাংলায় নেই। প্রয়োজন পড়েছিল তাই ক্রিকেটীয় পারিভাষিক শব্দ সৃষ্টির, আর নতুন শব্দ সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের চাইতে ভালো বিকল্প বাংলায় কে-ইবা হতে পারতেন!

ব্রজরঞ্জন রায় সমস্যার সমাধানে ছুটে গিয়েছিলেন রবিবাবুর কাছে। সব শুনে-টুনে কবিগুরু বলেছিলেন, ভয়শূন্য চিত্তে নতুন শব্দ উদ্ভাবন করে ফেলতে। রবীন্দ্রনাথের বিচক্ষণতার এক পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল ব্রজরঞ্জন রায়ের সঙ্গে এই আলাপেই। কেননা, নতুন পারিভাষিক শব্দ সৃষ্টি নিয়ে ব্রজরঞ্জন ভয় পাচ্ছিলেন, তার ব্যবহৃত শব্দগুলো কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে এ নিয়ে ছিলেন দ্বিধান্বিত, বিশ্বকবি তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন এই বলে, ‘আজ যা নতুনত্বের কারণে অদ্ভুত, সময়ের পরিক্রমায় তা-ই হয়ে যাবে অবিচ্ছেদ্য।’

সমর্থন পেয়ে ব্রজরঞ্জন রায় উদ্ভাবন করেছিলেন বেশ কিছু ক্রিকেটীয় পরিভাষার। আজ প্রায় শতবর্ষ পরেও সেসব শব্দের ব্যবহার হচ্ছে দেখে বলা যায়, আরও অনেক বিষয়ের মতো ভবিষ্যদ্বাণীতেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নির্ভুল ছিলেন।

_______________

ক্রিকেটের সঙ্গে রবি ঠাকুরের সম্পর্কের আরেকপ্রস্থ প্রমাণ মেলে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের এক বাংলা দৈনিকের কল্যাণে। ‘রবীন্দ্রনাথ এবং ক্রিকেট’ শিরোনামে প্রকাশিত হওয়া ওই লেখা থেকেই জানা যায়, কেবল সুভাষ চন্দ্র বোসের ইউরোপ যাত্রা শুরু হয়েছিল দেখেই নয়, বিহারের গোমহ শহরটি বিখ্যাত হয়ে রইবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানটায় ক্রিকেট খেলেছেন বলেও।

অবশ্য সেখানটায় রবীন্দ্রনাথের ক্রিকেট খেলাটা নেহায়েতই ঝোঁকের বশে। গোমহ শহরে রবি ঠাকুর গিয়েছিলেন ঝটিকা সফরে, যাবার পরে এক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করবেন বলে ভূত চেপেছিল মাথায়। ডাক দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের নানা প্রান্তের রাজা-মহারাজাদের। তার নিমন্ত্রণ পেয়ে হাজির হয়েছিলেন ভিজিয়নগ্রামের মহারাজকুমার, পাতিয়ালা আর কুচবিহারের মহারাজা। খেলার মান যে বেশ ভালোই ছিল, খেলোয়াড় তালিকায় ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলা দুই ক্রিকেটার, ইফতিখার আলী খান পতৌদি আর দুলীপ সিংজির নাম দেখেই অনুমান করে নিতে কষ্ট হবে না নিশ্চয়ই।

_______________

ওই ম্যাচের অন্দরে কি হয়েছিল তার চাইতে বরং ম্যাচের আনুষাঙ্গিক বৃত্তান্তই পাওয়া যায় বেশি। ম্যাচ উপলক্ষে বানানো অস্থায়ী স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল দর্শকে। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এদের মাঝে শাড়ি পড়ে উপস্থিত ছিলেন বেশকিছু সংখ্যক নারী দর্শকও। ম্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাজানো হয়েছিল সানাই, পাতিয়ালার মহারাজা আয়োজনের চাকচিক্য বাড়াতে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন ব্যান্ড। প্রফেসর ক্ষিতিমোহন সেন (অমর্ত্য সেনের পিতা) আর আচার্য্য বিধুশেখর শাস্ত্রী বেদমন্ত্র পড়ে শুরু করেছিলেন ম্যাচের আনুষ্ঠানিকতার।

পুরো ভারতবর্ষ তখন দুলছিল স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে। আন্দোলনের সমর্থনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যাট করতে নেমেছিলেন ধুতি আর টোকা পড়ে৷ এমনকি যে ব্যাট নিয়ে তিনি খেলতে নেমেছিলেন, তা-ও বানানো হয়েছিল দেশি কাঠে। ওই ধুতি-টোকা পরে রবীন্দ্রনাথ কত রান করেছিলেন, ম্যাচের ফলাফল কি হয়েছিল, তা অবশ্য জানা যায় না কোনো লেখা থেকে।

এর চাইতে বরং ঐতিহাসিকগণ সংরক্ষণে রাখতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আয়োজিত এই ম্যাচটির বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াকে। ক্রিকেটের চূড়ান্ত বাণিজ্যিকীকরণ করেছে বলে আজকাল ভারতের বাপান্ত করে ছাড়ে অনেকে, সে হিসেবে কিছুটা দায় তো বর্তায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপরেও। রবীন্দ্রনাথের ম্যাচ উপলক্ষে সেবার বিহারে হাজির হয়েছিলেন কলকাতার তৎকালীন স্বনামধন্য সব ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রির প্রতিষ্ঠান, মাঠের আশপাশে তারা সাজিয়ে বসেছিলেন পণ্যের পসরা। ক্রিকেট ম্যাচও যে হতে পারে বাণিজ্যের মাধ্যম, ভারতবর্ষ তো তা জেনেছিল রবীন্দ্রনাথের কল্যাণেই।

ব্রজরঞ্জন রায়ের সুবাদে জড়িয়ে পড়েছেন বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের সঙ্গে, বিহারের ম্যাচে ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণ করে সেই সম্পর্ক করেছেন আরও গভীর। ক্রিকেট নিয়ে তাই কখনো কিছু না লিখলেও, রবীন্দ্রনাথের জীবন থেকে ক্রিকেটকে আলাদা করা যাচ্ছে কি করে!