দহন উৎসবের অদম্য নটরাজ

বুনো, নির্ভীক, আনন্দময় ক্রিকেটের প্রতীক। তাঁর ব্যাটিং ছিল যুক্তির বাইরে, কৌশলের বাইরে—সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তাঁর মত আর কেউ আসেননি। আর আসবেন কি না, সন্দেহ থাকছেই।

ক্রিকেট নামের মহাকাব্যে তাঁর ব্যাট যেন ছিল এক দুরন্ত ধূমকেতু। শচীন টেন্ডুলকারের পথ অনুসরণ করে, ঠিক তাঁরই ছায়া ছুঁয়ে, ২০১১ সালের ৮ ডিসেম্বর বীরেন্দ্র শেবাগ লিখলেন এক অনন্য অধ্যায়—ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরির গল্প।

গোয়ালিয়রে শচীনের ২০০ যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, শেবাগ সেই আগুনকেই ইন্দোরে রূপ দিলেন দহন-উৎসবে। ওই সিরিজে সিনিয়রদের বড় অংশ অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সফরে পাড়ি জমালেও শেবাগ ভারতেই থেকে গেলেন।

যেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল সেই মহাকাল। উইন্ডিজের বিপক্ষে ইন্দোরের হোলকার স্টেডিয়ামে তাঁর ব্যাট হাতে নামা মানেই ঝড়ের পূর্বাভাস। বোলাররা তখনও বুঝে ওঠেননি, আর শেবাগ ততক্ষণে শুরু করে দিয়েছেন তাঁর ধ্বংসযজ্ঞ।

১৪৯ বলে ২১৯—সংখ্যাটা যেন ক্রিকেটীয় কবিতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অনালোচিত, অথচ সবচেয়ে সুরেলা পঙ্‌ক্তি। ২৫টি চার, ৭টি ছক্কা; প্রতিটি শটে যেন ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।

স্ট্রাইক-রেট ১৪৬.৯৭—যেন ব্যাটের নিচে লুকিয়ে থাকে এক অসীম উচ্ছ্বাস। শুরুতে গৌতম গম্ভীরের সঙ্গে ১৭৬ রানের জুটি, পরে সুরেশ রায়নার সঙ্গে আরেক ঝলমলে পার্টনারশিপ—কিন্তু শেবাগের ছন্দ ছিল আলাদা; তিনি লিখছিলেন নিজের মহাগাঁথা।

দুটি ক্যাচ দিয়ে জীবন পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু এমন দিনে তাঁকে থামানোর ক্ষমতা কারও ছিল না। ৪৪ তম ওভারে আন্দ্রে রাসেলকে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে পৌঁছে গেলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। যেন মাঠ জুড়ে উদ্ভাসিত হলো এক অনন্য দিগন্ত।

এরপর আরেকটি বড় শট খুঁজতে গিয়ে কাইরেন পোলার্ডের হাতে ধরা পড়লেন তিনি—স্কোরবোর্ডে তখন নামের পাশে ২১৯ রান; ভারত তখন পৌঁছে গেছে অদম্য উচ্চতায়।

এই ইনিংস শুধু রান নয়, ছিল এক মাস্টারক্লাস—যেখানে রোহিত শর্মা, তরুণ বিরাট কোহলিরা কাছ থেকে দেখলেন কীভাবে একজন ব্যাটার স্রেফ ইচ্ছাশক্তি আর প্রতিভায় ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দিতে পারে। ভারত পাঁচ উইকেট হারিয়ে করে ৪১৮ রান।

পাহাড় নয়, এক বিশাল ধারালো পর্বত। ক্যারিবিয়ানরা চাপের মুখে ভেঙে পড়ল, অল-আউট হল ২৬৫ রানে। আর ইন্দোরের আকাশে তখন ভাসছিল একটাই নাম—বীরেন্দ্র শেবাগ, প্রলয়ের অন্য নাম। সত্যি, শেবাগ যেদিন ছন্দে থাকবেন, পৃথিবীর বাকি সব কিছু তখন মিথ্যা।

বুনো, নির্ভীক, আনন্দময় ক্রিকেটের প্রতীক। তাঁর ব্যাটিং ছিল যুক্তির বাইরে, কৌশলের বাইরে—সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তাঁর মত আর কেউ আসেননি। আর আসবেন কি না, সন্দেহ থাকছেই।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link