এটা একটা অবহেলিত কাহিনি, এক অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকা গল্প। সেখানে কেউ শুনে না, কেউ দেখে না, কিন্তু যিনি সবসময় আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তার নামটাও প্রায় ভুলে যায় সবাই। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, আর্জেন্টিনার নিঃশব্দ নায়ক, যাকে কখনো পূর্ণ সম্মান দেয়নি সেভাবে কেউ।
লিওনেল মেসির ছায়ায় যেন স্নিগ্ধ হয়ে গিয়েছিল তার অস্তিত্ব, অথচ এই মেসির সঙ্গে ভাগ করা প্রতিটি মুহূর্তে অদৃশ্যভাবে ছিলেন ডি মারিয়া। কোপা আমেরিকার ফাইনাল, বিশ্বকাপের ফাইনাল—যত কিছু অর্জন, সেখানে তার অবদান ছিল যেন এক অব্যক্ত গল্প।
২৮ বছর পর আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেওয়ার গল্পের এক অংশ তিনি—তিন গোল, তিন শিরোপা। অথচ কখনও তার নামের দিকে মাথা ঘুরে না, কখনও তার সংগ্রামের, তাঁর ঘামের মূল্যায়ন হয় না।

অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া নামটা রোজ আলো ঝলমলে ক্যামেরার সামনে আসে না, যেটি কখনোই আড়ালে থাকে না, কিন্তু কখনওই আলোয় টিকে থাকতে পারে না। ফুটবলের ইতিহাসে অনেক নায়ক এসেছে, কেউ বা আকাশী, কেউ বা সোনালি, কেউ বা সবুজ মাঠে রচিত একেকটি কাব্য।
কিন্তু ডি মারিয়া? সে যেন অন্ধকারের মধ্যেও আলো ছড়ানোর চেষ্টা করে যাওয়া এক নি:শব্দ যোদ্ধা। এই নামের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য স্মৃতি — তিনিই তো আর্জেন্টিনার শিরোপা খরা কাটিয়েছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সময়ের প্রায় সবগুলো শিরোপাতেই জড়িয়ে আছে তাঁর নাম।
কিন্তু এসব অর্জনও যেন কখনো তার মুকুটে এক সঠিক জায়গা পায় না। লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো মহাতারকারা সবসময় আলো কেড়ে নেয়, তাদের বিশাল প্রাপ্তি নিয়ে সমালোচনা-প্রশংসার ঝড় বয়ে যায়, অথচ ডি মারিয়া তার ক্ষুদ্রতর সফলতাগুলোকেও আলোকিত করে দেন।

সারাটা ক্যারিয়ারেই তিনি থেকেছেন আড়ালে, কখনো মেসির পাশে, কখনো রোনালদোর তলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে হয়তো তিনি কখনোই মুখ্য ভূমিকা পাননি, কিন্তু যে মঞ্চে কেউ না কেউ পড়ে যায়, সেখানে ডি মারিয়া তুলে ধরেছেন আর্জেন্টিনাকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার গোল, ২০১৫ কোপায় সেই বলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য—এই সবই তো গল্প, অথচ ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া!
ডি মারিয়ার ক্যারিয়ার কেবল সংখ্যা, গোল বা শিরোপার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার নীরব সংগ্রাম, তার অপ্রকাশিত নেতৃত্ব—এগুলোই তাকে মহান করেছে। তিনি যে কখনো আলো চেয়েছেন, তা নয়। তিনি কেবল নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন দলের জন্য, যখনই আর্জেন্টিনা সংকটে পড়েছে, তখনই ডি মারিয়া এসে অন্ধকারে আলো জ্বালিয়েছেন। তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার পাশে, শুধু মাঠেই নয়, আড়ালে থেকেও।
আজ যখন ডি মারিয়া ক্যারিয়ারের শেষ ফাইনালের দিকে এগোচ্ছেন, এক সময়ে এই আকাশী নীল জার্সি গায়ে প্রতিটি মুহূর্তে নিজের অস্তিত্ব ঢেলে দিয়েছিলেন—তার সেই অবদান বোধহয় কখনো নীরব হতে পারে না। এর সঙ্গে ডি মারিয়ার ইতিহাস কখনোই ভোলা যাবে না।

তিনি আর্জেন্টিনার কোটি কোটি ভক্তের মধ্যে এক অদৃশ্য স্থান পেয়েছেন—একটি জায়গা, যেখানে নামমাত্র সম্মান তার জন্য অপেক্ষা করছে না। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, আর্জেন্টিনার অম্লান সূর্য কে? – তাহলে নিশ্চিতভাবে উত্তর আসবে একটাই — অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া।










