ওই ঝাকড়া চুলের ছেলেটা যখনই নেমেছে ইংলিশ প্রিমিয়র লিগের মাঠে, এই তল্লাটে তখন গর্বের আনন্দ উদ্বেলিত করে গেছে সবাইকে। মনের কোণে এক সুপ্ত বাসনা ঘর বেঁধেছিল। ইশ! হামজা যদি খেলতেন বাংলাদেশের জার্সিতে! বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সেই বাসনা হয়েছে বাস্তব। হামজা চৌধুরী গায়ে চড়িয়েছেন লাল-সবুজের জার্সি।
আজ থেকে প্রায় ২৭ বছর আগে, ইংল্যান্ডের লেস্টারশায়ারে জন্ম হামজা চৌধুরীর। ১৯৯৭ সালের পহেলা অক্টোবর তিনি ভূমিষ্ঠ হন। যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা। লেস্টারশায়ারে কেটেছে তার ছেলেবেলা। ইংলিশ ফুটবলের বেশ সুপরিচিত ক্লাব লেস্টারসিটি এফসিতে হামজার ফুটবলের হাতেখড়ি। দলটির একাডেমিতে তিনি একটু একটু করে নিজেকে গড়েছেন।
সেই ধারাবাহিকতায় লেস্টারের প্রথম দলের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেও মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশের হামজা। এমনকি ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন ইংলিশদের। লেস্টার সিটির হয়ে তিনি জিতেছেন এফএ কাপের মত টপ লেভেল শিরোপাও। এমন একজন খেলোয়াড় বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেটা ছিল রীতিমত এক দিবাস্বপ্ন।

দীর্ঘ সময় ধরে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। ডালপালা মেলে রীতিমত এক বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে সেই গুঞ্জন। অপেক্ষার প্রহরে নির্ঘুম রাত কাঁটার মত করেই যন্ত্রণা বেড়েছে। হামজা আসি আসি করেও আসেন না। এই বাংলাদেশের রাত জেগে ফুটবল দেখা প্রজন্মকে দেশের ফুটবল থেকে রীতিমত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারাও দলে দলে ফিরতে শুরু করলেন। শুধু একটা বাক্যে, ‘হামজা আসছেন’।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে হামজা রাখলেন বাংলাদেশে পা। এয়ারপোর্টে রীতিমত সমর্থক ও পাগলাটে ভক্তদের উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্যে দিয়ে প্রতিটি কদম ফেলেছেন হামজা। তার ওই অবিশ্বাস্যের নয়নই বলে দিচ্ছিল, এতটাও ভালবাসা তার ছিল না প্রত্যাশিত। তবে এই ব-দ্বীপে ফুটবলের উন্মাদনা যে আকাশচুম্বী। দুই মহল্লার ফুটবল দ্বৈরথেও তো গাছের মগডাল বনে যায় সবচেয়ে আকর্ষনীয় সিটিং পজিশন।
হামজা শুধু তাকিয়ে রইলেন বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে। তিনি বুঝে গেলেন, ইংল্যান্ডে জন্ম হলেও, তার জন্যে প্রেয়সীর চাইতেও কম প্রেম নেই বাংলাদেশের মানুষের। প্রথম যেদিন তিনি ভুটানের বিপক্ষে গোল করলেন লাল রঙা জার্সি গায়ে, সেদিন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া কেঁপে উঠেছিল এক প্রবল গর্জনে। সুন্দরবনের গহীনে থাকা বাঘের গর্জন যেমন শোনা যায় উপকূল থেকেই- তেমন চিৎকারে প্রকম্পিত হয়েছে গোটা গুলিস্তান।

জামাল ভুঁইয়ার কর্ণার থেকে হামজার হেডে গোল, বাংলাদেশের ফুটবলের আইকনিক এক গোল! কত প্রতীক্ষার ফসল! হামজার সেই অন্তর্ভুক্তি একঝাঁক তরুণ ফুটবলারকে উজ্জীবিত করেছে প্রাণের টানে এই বাংলায় ফিরতে। ফুটবল নামক বিস্তৃর্ণ চরে লেগেছে প্রাণের সঞ্চার। উঠেছে নব জোয়ার। প্রবল খরস্রোতা এক অবারিত ধারায় পরিণত হবে বাংলাদেশের ফুটবল, পথিকৃৎ হবেন হামজা- প্রত্যাশা এখন সেটুকুই।











