যতক্ষণ ব্যাট চলবে, আভিজাত্য থাকবে। আগ্রাসন থাকবে। যখন ব্যাট আর কথা বলবে না, তখন কি সব শেষ? না, সময় আর স্মৃতির খামে যুবরাজ সিং নামের নক্ষত্র আজও তরুণ, আজও একই রকম আগ্রাসী তাঁর কলার তোলা রোয়াব।
সেই চোখে চোখ রেখে ব্যাটের ঝড়, সেই গ্যালারি কাঁপানো চার-ছক্কার বন্যা, হেলমেটের ফাঁক গলে এক চিলতে হাসি, আর বোলারদের অসহায়ত্ব, এ সবের ভিড়ের যুবরাজ সিং হারিয়ে যান কি করে।
সময় আসলে ইলাস্টিকের মত। কখনো টেনে নিয়ে যায় বাবার ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট টিভির সামনে, কখনো মাইলো ব্যাটে পুড়ে যাওয়া দুপুরে, আবার কখনো স্কুলড্রেস মাখা আমাদের কিশোর বেলার মাঠে— যেখানে একটি ছেলের ব্যাট সুইং দেখে মনে হতো, আমাদেরই মতো কেউ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বমঞ্চে।
যুবরাজ সিং— শচীন টেন্ডুলকারের পরিমিত স্ট্রেটড্রাইভ আর দ্রাবিড়ের শীতল দেওয়ালের বিপরীত মেরু। তিনি ছিলেন পাড়ার দস্যিদলের ক্যাপ্টেন। যে দল ল্যান্ডলাইনের সবুজ আলো জ্বলে উঠলে ছুটে যেত মাঠে, যে দল বল ফস্কালেও সাহস হারাত না, যে দল জানত— ডানহাতি গিলেস্পির শর্ট বলে এক বাঁহাতি বাচ্চা ব্যাট ঘোরালেই গ্যালারিতে পড়বে নির্বিকার এক বজ্রপাত।

সবােই আসলে জানত— যুবরাজ নামলে কিছু একটা ঘটবেই। হয়ত আউট হবে, হয়ত অস্থিরতা বাড়াবে, কিন্তু মাঝবেলা ঘুমে ডুবে থাকা ম্যাচটাকে সে জাগিয়ে তুলবেই— এটাই ছিল বিশ্বাস।
২০০০ সালে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অন্ধকার ফাটল পেরিয়ে যখন ছেলেটা জাতীয় দলে ঢুকল, সবাই দেখল— চিড়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের ওপর পাঞ্জাবি মাস্তানির স্টিকার জুড়ে দেয়ার নামই যুবরাজ। ছেলেটা তখনই বলে ফেলেছিল — যাব তাক বাল্লা চাল রাহা হ্যায়, ঠাঁট হ্যায়…’
বাকিটা কেউ চায়নি— কারণ সবাই জানত, তার ঠাঁট থামার নয়। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে যখন ১৪৬-৫ এ ভারতের স্বপ্ন নিভে যাচ্ছিল, তখন যুবরাজ এসে বললেন— রূপকথা আবারও লেখা যায়।
দ্রাবিড়–শচীন–সৌরভের গাম্ভীর্য যেখানে শেষ, দামাল কৈশোর সেখানেই শুরু। যুবরাজ ছিল সেই সেতুবন্ধন— পাড়ার ক্রিকেটের ঘাম আর লর্ডসের রাজত্বকে, একসঙ্গে বেঁধে দেয়া এক দুর্লভ জাদুর নাম।

তার চোখ, উফ কি আগুন মাখা সেই চাহনী! সাঙ্গাকারার উইকেট তুলে নেওয়ার পর যে চোখে বিশ্ব দেখেছিল শিকারির সত্যিকারের আগ্রাসন— বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের নয়, মানুষের সামনে দাঁড়ানো বাঘের হুঙ্কার, চোখের ভাষায়!
কিন্তু সময়ের এই ইলাস্টিক সবার মতো তাকেও ছাড়েনি। সবাই বড় হয়ে গেছে, স্কুল থেকে কোচিং, মাঠ থেকে বই—
সব বদলাতে থাকল নি:শব্দে। সময়ের পাশ দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া একটি বল, যেভাবে কেউ থামিয়ে দিতে পারে না, যুবরাজও পারেননি। ঠিক যেমন ফুল স্যুইংয়ে থাকা তাঁর ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারি।
ব্যাটের সুইং যতই শক্তিশালী হোক, সময় নামের বোলারকে তো আর কেউ ছক্কা মারে না। তবুও, যখনই টেলিভিশনে দেখা যায় যুবির ছক্কা, সময় টেনে নিয়ে যায় ক্যাসেটের দুনিয়ায়— রিস্টব্যান্ডের, বাবলগামের, ফাঁকা রাস্তায় হাত ঘোরানোর,আদিম ক্রিকেট স্বপ্নের দুনিয়ায়।
শুধু ক্রিকেটার নয়— যুবরাজ সিং এক সিরিয়াল উইনার। ক্যান্সারও তাকে হারাতে পারেনি, ক্রিকেট তো দূরের কথা। কোনো ষড়যন্ত্র-কোনো প্রোপাগাণ্ডার কাছে তিনি হার মানেননি। অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৯, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ বিশ্বকাপ— প্রতিটি মঞ্চে তিনি জিতেছেন, জিতিয়েছেন।

অবসর জীবনেও— রোড সেফটি ট্রফি, ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডস, ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্স লিগ— যেখানেই গেছেন, ট্রফির রঙ হয়ে ফিরেছেন। ক্রিকেটে কিছু মানুষ আসে শুধু খেলার জন্য নয়, জেতার জন্য জন্ম নিয়েই। যুবরাজ সিং তাদেরই একজন।
২০১১ বিশ্বকাপে ব্রেট লিকে চার মেরে যে বুনো উল্লাসে তিনি হাত তুলেছিলেন, সেই ছবিটাই— সেই আগুনটাই—
ব্যাট ঘোরানোর সেই অমোঘ নাচটাই— তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের সারাংশ থেকে যায়। ‘যাব তাক বাল্লা চাল রাহা হ্যায়…’ বাকিটা কেন বলবে যুবরাজ? কিছু, গল্প অসমাপ্ত থাকলেই তো জীবন সুন্দর।










