মাঠে নামলে যেন আগুন জ্বলে উঠত। এক সময় ছিল যখন উইকেট পড়ামাত্র চেয়ার ছুড়ে উঠে দাঁড়াত সে, চোখে আগুন, শরীরে বিদ্যুৎ—আর পাশে বসে কোচ রবি শাস্ত্রী হাসতেন, বলতেন, ‘শান্ত হও ভাই, অন্তত ওকে অর্ধেক পথ পেরোতে দাও।’
সেই আগুনঝরা তরুণ আজ অনেকটাই বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার আগ্রাসন পরিণত হয়েছে সংযমে, আবেগের জায়গা নিয়েছে প্রজ্ঞা। বিরাট কোহলির এই রূপান্তরই আজ ভারতীয় ক্রিকেটের এক নতুন গল্প।
রবি শাস্ত্রী সম্প্রতি এক পডকাস্টে গিয় ফিরেছিলেন সেই দিনগুলিতে—যখন কোহলি ছিলেন অধিনায়ক, আর ভারতীয় দল ছিল এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের পথে। শাস্ত্রীর ভাষায়, কোহলি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি মাঠে কারও প্রতি ছাড় দিতেন না—নিজের প্রতি যেমন না, দলের প্রতিও না।
কেউ অলসভাবে দৌড়ালে বা রান নিতে দেরি করলে, তার চোখে ধরা পড়ত কঠোর দৃষ্টি। শাস্ত্রী বলেন, ‘যদি কেউ দ্বিতীয় রান নিতে হিমশিম খেত, আর বিরাট তখনও তৃতীয় রান খুঁজত, তখনই শুনত, যাও, জিমে যাও, আরও ফিট হও।’

তার অধিনায়কত্বে ভারতীয় ক্রিকেটে জন্ম নেয় এক নতুন সংস্কৃতি—ইয়ো-ইয়ো টেস্ট। শুধু প্রতিভা নয়, এখন দলে জায়গা পেতে হলে দরকার ছিল শরীরের দৃঢ়তা, মানসিক শক্তি আর অদম্য পেশাদারিত্ব। রবি শাস্ত্রীর কথায়, ‘ওই সময়টা ছিল একটা বিপ্লব। ভারতীয় দল তখন শিখছিল, শুধু ক্রিকেট খেললেই হবে না—দলে থাকতে হলে নিজের শরীরকেও খেলোয়াড় বানাতে হবে।’
বিরাটের এই কঠোরতার ফলও এসেছিল। তার নেতৃত্বেই ভারত প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জেতে, টানা পাঁচ বছর ধরে নিজেদের দখলে রাখে আইসিসি টেস্ট মেস। মাঠে তার আগ্রাসন ছুঁয়ে গিয়েছিল পুরো দলকে, যেন এক বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিটি ক্রিকেটারের শরীরে।
তবু, এই উত্তেজনাই কখনও কখনও কোচ শাস্ত্রীর জন্য হয়ে উঠত চ্যালেঞ্জ। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শাস্ত্রী বলেন, ‘উইকেট পড়ামাত্র ও লাফিয়ে উঠত, যেন এখনই মাঠে নেমে যাবে। আমি বলতাম, ধৈর্য ধরো, অন্তত ওকে বাউন্ডারির কাছে আসতে দাও। ওর ভেতরে ছিল এক অবিরাম আগুন।’
কিন্তু আগুনও একদিন স্থির হতে শেখে। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রাসন পরিণত হয়েছে ভারসাম্যে। ২০১৭ সালের বর্ডার-গাভাস্কার সিরিজের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় এক তেজী, সংঘাতপ্রবণ কোহলিকে; আজকের কোহলি অনেকটাই অন্য মানুষ। চোখে এখনো আগুন আছে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত; উত্তেজনা আছে, তবে তা শৃঙ্খলায় বাঁধা। মাঠে তার দৃষ্টিতে এখন আগ্রাসনের বদলে দেখা যায় আত্মবিশ্বাসের স্থিরতা।

রবি শাস্ত্রীর মতে, কোহলির অধিনায়কত্ব হয়তো বড় কোনো আইসিসি ট্রফি এনে দেয়নি, কিন্তু তৈরি করেছে ভারতের ক্রিকেটের নতুন ভিত। ফিটনেস, শৃঙ্খলা, আত্মনিবেদন—এই তিনটি শব্দ এখন ভারতীয় দলের পরিচয়, আর এর সূত্রপাত কোহলির হাত ধরেই।
শাস্ত্রী বলেন, ‘আমরা শুধু ম্যাচ জিতিনি, আমরা বদলে দিয়েছিলাম ভাবনা। এখন প্রতিটি খেলোয়াড় জানে, মানসিক শক্তি আর শারীরিক ফিটনেস একে অপরের পরিপূরক।’
বছর ঘুরে এখন ৩৬ বছরের বিরাট কোহলি অনেক বেশি স্থির, সংযত। আগ্রাসন হারিয়ে যায়নি, কেবল রূপ বদলেছে। তা এখন আর চোখের চাহনিতে নয়, লুকিয়ে আছে এক অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের হাসিতে, যিনি জানেন কখন আগুন জ্বালাতে হয় আর কখন সেটি নরম আলোয় পরিণত করতে হয়।
বিরাট কোহলির গল্প তাই শুধু এক অধিনায়কের নয়—এ এক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের ইতিহাস। এক তরুণ, যিনি আবেগ দিয়ে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিলেন, শেষমেশ হয়ে উঠলেন এমন এক প্রতীক, যিনি শেখালেন—শক্তির প্রকৃত রূপ হলো নিয়ন্ত্রণ। আর হয়তো এ কারণেই, সময় যতই এগিয়ে যাক, ভারতীয় ক্রিকেটে কোহলির প্রভাব থাকবে অনন্ত—এক আগ্রাসী হৃদয়ের সংযত প্রতিধ্বনি হয়ে।











