রাত যত গভীর হয়, স্মৃতিরা তত জোরে ধাক্কা দেয়। পুরনো দিনের ক্রিকেট ধারাভাষ্য সেই ধাক্কার প্রভাবক হয়। কোথাও ধুলো জমে থাকা ছেঁড়া প্যাড, রঙচটা মাইলো ব্যাট—তাতেই চোখ মেলে ওঠে শচীন টেন্ডুলকার আর সৌরভ গাঙ্গুলি যুগের সেই দিনগুলো। সেই দুপুর, যখন মাঠে নামতেন দুজন, আর ছোট্ট শৈশবের জীবনগুলো রঙিন হয়ে উঠত ব্যাট আর বলের ব্যাখ্যাতীত কবিতায়।
১৩৬ বার ওপেনিং জুটি। রান ৬৬০৯। তবু সংখ্যাগুলো এই সম্পর্কের গভীরতা বলে না। রেকর্ডের বাইরেও ছিল এক অদ্ভুত সুর — যা শচীনের ব্যাটে নিখুঁত ইনিংস বিল্ডআপে ফুটে উঠত, আর সৌরভের অফ স্টাম্পের বাইরের আগ্রাসনে বিস্ফোরণ ঘটাত। মনে হত, রূপকথার দুই সেনাপতি ব্যাট হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন অন্ধকার দূর করতে। সেই অন্ধকারের শেষে লেখা হত ভোর, লেখা হত রূপকথা। সেই রূপকথার নায়ক ছিলেন শচীন আর সৌরভ।

শচীন ছিলেন একাগ্র তপস্বী, সৌরভ সেই চতুর রণকৌশলী। শচীনের একরোখা অধ্যবসায়ে যখন ম্যাচ এগিয়ে যেত, সৌরভ তখন ডানপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শত্রুর ভীত কাঁপিয়ে দিতেন স্কয়ার ড্রাইভ আর ছয়ের ফুলঝুরিতে। ম্যাচ বের হয়ে যেত প্রতিপক্ষের হাত থেকে। রাত শেষে যেমন দিন হল, এই দু’জন ব্যাট করলে তেমনি জয় আসতে বাধ্য।
তাদের বন্ধুত্ব ছিল নিরুত্তাপ এক আলো। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলকানি ছিল না, হাতে হাতে ভিডিও ছড়াত না, তবুও শৈশবের স্মৃতিতে একফ্রেমে বাঁধা ছিলেন তারা। কারণ, তারা ছিলেন সময়ের ছাপ—একটা প্রজন্মের গড়া ঘর, যার দেয়ালে পোস্টার টাঙানো থাকত শচীনের স্ট্রেট ড্রাইভ আর সৌরভের ছক্কা হাঁকানো সেই দৃশ্যপট।

২০০৭-এর পর একসাথে ব্যাট হাতে নামা হয়নি আর। তারপর কেটে গেছে কত সময়। শৈশব, কৈশোর কিংবা তারুণ্য কেটে গেছে! তবু আজও যখন ক্রিকেট নিয়ে কোনো গল্প হয়, তখন ওপেনিং জুটির কথা উঠলেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন তাঁরা দু’জন। কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে —‘সেরা ওপেনিং জুটি কারা?’—চোখ বুজে উত্তর আসে, শচীন টেন্ডুলকার আর সৌরভ গাঙ্গুলি।
আজকের ব্যস্ত জীবনে হয়তো তারা ব্যাট হাতে নেই, কিন্তু তাদের গল্প আছে প্রতিদিনের রাতজাগায়, ছাদের এক কোণে একা দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোরের মধ্যে, যে আজও বিশ্বাস করে—রাতের আকাশ ভেদ করে নামবেন শচীন-সৌরভ, আবার ব্যাট হাতে নামবেন জয়ের খোঁজে।

এই গল্প শুধু ওপেনিং জুটির না, এই গল্প কৈশোরের, বড় হয়ে ওঠার, আর একটা প্রজন্মের নায়ক হয়ে ওঠা দুই মানুষের। যারা বন্ধু ছিল কিনা জানা নেই, কিন্তু যারা জীবনের অজান্তে হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে প্রিয় জুটি। রাত নামলে আজও বৃষ্টি হয়। আর সেই বৃষ্টির শব্দে ফিরে আসেন তারা — ব্যাট হাতে, উইকেটের মাঝে দৌড়াতে থাকা দুই নায়ক, শচীন আর সৌরভ।










