বিসিবির করিডরে এখন অদ্ভুত এক নীরবতা। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে বোর্ড উত্তপ্ত বক্তব্যে মুখর ছিল, আইসিসি বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের নাম ঘোষণা করার পর থেকে সেই উত্তাপ হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেছে। সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, যিনি কিছুদিন আগেও নিয়মিত শক্ত বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তিনিও এখন নিশ্চুপ। দেশে আছেন নাকি অস্ট্রেলিয়ায়, সেটাও বলা যাচ্ছে না।
বিসিবির ভেতরে অনেকেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন—বাংলাদেশকে বাদ দিলে পাকিস্তানও বিশ্বকাপ খেলবে না। সেই ভরসাতেই হয়তো সাহস জমেছিল। কিন্তু পাকিস্তান বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করতেই সেই আশার বেলুন ফেটে যায়। ধাক্কাটা ছিল প্রবল। এখন আর আইসিসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পথে হাঁটছে না বিসিবি।
শনিবার বোর্ড সভা শেষে মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন পরিষ্কার করেই জানিয়ে দিয়েছেন—আইসিসি বোর্ডের সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিয়েছেন, সালিশি আদালত বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় যাওয়ার চিন্তাও নেই। আসলে ৩ জানুয়ারি মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর থেকেই বিসিবিতে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটে গেল বুধবার আইসিসির সভায় ভোটিংয়ের পর।

কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্রিকেট কূটনীতিতে যে লড়াই চালানোর চেষ্টা হয়েছিল, সেখানে বিসিবি কার্যত একা পড়ে যায়। পাকিস্তান ছাড়া আর কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। এমনকি শনিবার পর্যন্ত পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ তুললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বয়কটের হুমকি দিয়েও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত দল ঘোষণা করায় বিসিবির একাকীত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিসিবির সামনে সুযোগ ছিল সুইজারল্যান্ডের কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টসে (সিএএস) যাওয়ার। কিন্তু বাস্তবতার চাপ আর আন্তর্জাতিক সমীকরণ বুঝেই সেই পথেও হাঁটছে না বোর্ড। উল্টো, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—আইসিসি নাকি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকেই কড়া বার্তা দিয়েছে।
বিশ্বকাপ বয়কট করলে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ, পিএসএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের এনওসি না দেওয়া, এমনকি এশিয়া কাপ থেকে বাদ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারে আইসিসি। নিয়ম অনুযায়ী, গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া কোনো টুর্নামেন্ট বয়কট করলে আইসিসির এমন ক্ষমতা আছে। এই ভয় বিসিবির মধ্যেও এখন বেশ স্পষ্ট।

এর ওপর বোর্ডের ভেতরের আগুনও ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। পরিচালক ইশতিয়াক সাদিক ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন, আরও দুজন সেই পথেই হাঁটতে পারেন বলে গুঞ্জন। বিতর্কিত পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে আবার ফিন্যান্স কমিটির দায়িত্ব দেওয়ায় ক্রিকেটারদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ঢাকার ৪৫টি ক্লাব বর্তমান বোর্ডের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে লিগ বয়কট করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচি নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে—মার্চে পাকিস্তান আসবে ঠিকই, কিন্তু এপ্রিলের নিউজিল্যান্ড সফর, আগস্টের অস্ট্রেলিয়া সফর কিংবা সেপ্টেম্বরে ভারতের ঢাকা সফর আদৌ হবে কিনা, তা নিয়েই সংশয়ে বিসিবি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও একই চিত্র—১২ দলের মধ্যে আট দল বয়কটে থাকায় ঘরোয়া ক্রিকেট কার্যত অচল।
এই অস্থিরতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ক্রিকেটাররা—নিজেদের রুটিরুজি নিয়ে। প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিপিএল ক্রিকেটার জানালেন, সবাই তাকিয়ে আছে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিকে। অনেকেরই বিশ্বাস, নতুন সরকার এলে এই গুমোট পরিস্থিতির অবসান হতে পারে। তাদের ধারণা, বর্তমান সংকটের পেছনে ক্রিকেটের বাইরের কিছু শক্তির ভূমিকা আছে।











