আমার আসন আমাকে ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও আমার রাজমুকুট। যদি না দাও আমি ছিনিয়ে নেব অপ্রতিরোধ্য শক্তির ব্যবহার। যে শক্তি হার মানে না, হারতে জানে না। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ মঞ্চে অস্ট্রেলিয়া সত্যিই এই শক্তির ব্যবহার করেছিল। নিজেদের মাটিতে, নিজেদের আকাশের নিচে, যেন এক অপ্রতিরোধ্য অভিযানে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। আর সেই অভিযানের চূড়ান্ত গন্তব্য, বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি।
পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছিল দলটি। তবে লাল কালির দাগ যে একেবারেই ছিল না তা কিন্তু না। গ্রুপ পর্বে হারতে হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের কাছে। শ্বাসরুদ্ধকর এক লড়াই শেষে স্রেফ ভাগ্যের নির্মমতায় এক উইকেটের পরাজয় বরণ করতে হয় অস্ট্রেলিয়ার।
অজিদের দাম্ভিকতার চূড়ান্ত বিপর্যয় যেন ওটাই। তবে দলটা যে অস্ট্রেলিয়া, ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র যে তাদের রক্তস্রোতে বহমান সেই আদিম কাল থেকেই। ওই হারটা তাতিয়ে তুলল তাদের। আর নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে এক অদৃশ্য উড়োচিঠি যেন দিল, যাতে লেখা, আবার দেখা হবে, এ দেখায় শেষ দেখা নয়।
এরপর জয়ের নিশান উড়িয়ে ছুটতে থাকল তারা। মাইকেল ক্লার্কের শক্ত চোয়াল আর ক্ষুরধার নির্দেশনায় নতুন পথের সন্ধ্যান পেল তারা। দুদর্ন্ড প্রতাপে ফাইনালের মঞ্চে পৌঁছে গেল তারা। আর প্রতিপক্ষ হিসেবে সেই নিউজিল্যান্ড।

প্রতিশোধের আগুণ যেন জলন্ত লাভা হয়ে উপচে পড়ল মেলবোর্নের বুক চিরে। ১১ জনের চোয়াল শক্ত হলো, মুষ্টিবদ্ধ হাতে সংকল্প একটাই, জিততে হবে, ক্ষত এখনও মুছে যায়নি।
প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডও যে কম না। হার মানা তকমা নামের পাশে। পুরো টুর্নামেন্টে ছিল আগুনঝরা ছন্দে। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে এসে যেন থমকে গেল সেই আগুন।
মিচেল স্টার্কের আগুনঝরা স্পেল, মিচেল জনসনের আগ্রাসী মেজাজ, আর জেমস ফকনারের শিকারি চোখের সামনে ধুলিসাৎ হয়ে পড়ে কিউইদের ব্যাটিং লাইনআপ। এক গ্রান্ট এলিয়ট বাদে কেউ দাঁড়াতেই পারেনি। ১৮৩ রানে গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। ফাইনালের মঞ্চে এমন স্কোর—যেন অস্ট্রেলিয়ার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ।
কিন্তু রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। অ্যারন ফিঞ্চ দ্রুত ফিরে গেলে চাপ এসে পড়ে। তবে সেই চাপকে নিজের কাঁধে তুলে নেন অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। এটা শুধুই একটা ইনিংস ছিল না, ছিল এক অধিনায়কের শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজের গল্পটা লিখে যাওয়ার চেষ্টা।

ব্যাট থেকে আসে ৭৪ রানের সেই চিরস্মরণীয় শেষ ইনিংস, সংখ্যার খাতায় যতটা প্রভাব ফেলে, অনুভূতিতে তার চেয়েও অনেক বেশি। ব্যাটে ছিল দৃঢ়তা, ছিল আত্মবিশ্বাস, আর ছিল এক ধরনের বিদায়ী সৌন্দর্য। অন্যপ্রান্তে স্টিভ স্মিথ ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক হয়ে।
শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটের সহজ জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু এই জয়ের পেছনে লুকিয়ে ছিল পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে এক আধিপত্যের গল্প। এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ছিল যেন এক ভয়ংকর যন্ত্র, যেখানে প্রতিটি অংশ নিখুঁতভাবে কাজ করেছে।
স্টার্ক ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা, তার সুইং আর গতি ভেঙে দিয়েছে একের পর এক ব্যাটিং লাইনআপ। ব্যাট হাতে ডেভিড ওয়ার্নার, ফিঞ্চ, স্মিথ—প্রত্যেকেই নিজেদের দিনে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। আর ফিল্ডিং? যেন মাঠের প্রতিটি ইঞ্চিতে ছিল অস্ট্রেলিয়ার দখল।
১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭, এরপর ২০১৫, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আরেকটি সোনালি মুকুট যোগ হয় অজিদের ট্রফি কেবিনেটে। এই জয় শুধু একটি দলের নয়, এটি একটি মানসিকতার জয়, যেখানে হার মানা নেই, থেমে যাওয়া নেই।











