অমিত প্রতিভা আর আক্ষেপের মিশ্রন

অমিত মিশ্রা তাই এক বিরল গল্প। আলো ছিল, সাফল্যও ছিল, কিন্তু কেন্দ্রের আলো কখনোই তার ওপর পড়েনি। তিনি ক্রিকেটের  সেই নেপথ্য এক গ্রাম্য কবি—যার কণ্ঠ শুনতে পায়নি সবাই, তবুও যার ছন্দ চিরকাল বাজবে আইপিএলের হ্যাটট্রিক-গাথায়, কিংবা বাংলাদেশের এক গ্রীষ্মের দিনে নাইটওয়াচম্যানের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে।

অদ্ভুত রকমের দু:খজাগানিয়া, খানিকটা রহস্যময়ও। অমিত মিশ্রর গল্প যেন সেই অচেনা গান, যেটা কখনও মঞ্চে বাজে না, কিন্তু ভিষণ সুরেলা। প্রতিভার আলো ছিল তাঁর শুরু থেকেই, কিন্তু ভাগ্য এমন নির্মম খেলা খেলেছে যে, সেই আলো কখনোই ভারতীয় দলে পুরোপুরি ছড়াতে পারেনি।

আক্ষেপটা আসলে না-পাওয়া থেকে নয়—আক্ষেপটা এই যে, এত ত্যাগ, এত কষ্ট, এত সাফল্যের পরও ক্রিকেটের কাব্যগ্রন্থে তার পাতাটি যেন সাদা রয়ে গেছে। অবসরের দিনেও না, কোনো আবেগী গদ্য রচনা হয়নি তার নামে। তিনি যেন চিরকালীন আড়ালের চরিত্র, অবহেলিত এক আন্ডাররেটেড নায়ক।

২০০৮ সালে মোহালির সবুজ ঘাসে যখন অনিল কুম্বলের ইনজুরি মিশ্রর সামনে দরজা খুলে দিল, তখনই যেন ক্রিকেট জানিয়ে দিল, এবার ভারতের নতুন লেগস্পিনার এসে গেছে। অভিষেক টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেট — তিন ম্যাচের সেই সিরিজে নেন ১৪ উইকেট।

আরেকটা অদ্ভুত কাকতাল—কুম্বলের বিদায়ী সিরিজ ছিল সেটাই। ক্রিকেট যেন উত্তরাধিকার সাজাচ্ছিল, কিন্তু ভারতের ক্রিকেটীয় চিন্তাধারায় লেগস্পিনের ভবিষ্যৎ জায়গা পেল না। কুম্বলের পর আর টেস্ট আক্রমণের কেন্দ্রে লেগস্পিনার রাখা হয়নি। মিশ্র তাই আট বছরে খেললেন মাত্র ২২ টেস্ট।

টি-টোয়েন্টির মঞ্চেও গল্পটা তেমনি বেদনার। ২০১৪ বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে ১০ উইকেট তুলে ভারতকে তুলেছিলেন ফাইনালে। কিন্তু, তিন বছরের মধ্যেই তিনি হারিয়ে গেলেন ভিড়ে। মোটে ১০ টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেললেন তিনি। অথচ তখনো বিশ্ব বুঝতে পারেনি, ভবিষ্যৎ ক্রিকেটে লেগস্পিনারদেরই হবে আসল সোনা। সেই বিশ্বকাপের পর মাত্র তিনটা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলার সুযোগ পেলেন।

তাই অবসরের দিনটাও কেটে গেল একরকম নিঃশব্দে। কেউ লিখল না—ভারতের অন্যতম সেরা লেগস্পিনার হতে পারতেন অমিত মিশ্র। কিন্তু তার কীর্তি অমর হয়ে আছে আইপিএলে। ইতিহাসের একমাত্র বোলার, যার তিন তিনটি হ্যাটট্রিক। ২০০৮ সালে দিল্লী ডেয়ারডেভিলস, ২০১১-তে ডেকান চার্জার্স, আর ২০১৩-তে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। সময় পাল্টেছে, দল পাল্টেছে, কিন্তু হ্যাটট্রিকের সেই কীর্তি আজও অপরাজেয়।

আরো এক জায়গায় বাংলাদেশের স্মৃতিও গেঁথে আছে তার গল্পে। ২০১০ সালের চট্টগ্রাম টেস্টে নাইটওয়াচম্যান হয়ে তিনে নেমে করলেন ৭০ বলে অর্ধশতক। ভারতের লিড বাড়ল, বাংলাদেশের সামনে দাঁড়াল পাহাড়সম রান তাড়া করার কাজ। শেষ পর্যন্ত তামিম ইকবালের হাফ সেঞ্চুরি আর মুশফিকুর রহিমের সেঞ্চুরির পরও হার এড়াতে পারল না বাংলাদেশ। কে জানে, মিশ্রর সেই অপ্রত্যাশিত ইনিংস না থাকলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম লিখত!

অমিত মিশ্রা তাই এক বিরল গল্প। আলো ছিল, সাফল্যও ছিল, কিন্তু কেন্দ্রের আলো কখনোই তার ওপর পড়েনি। তিনি ক্রিকেটের  সেই নেপথ্য এক গ্রাম্য কবি—যার কণ্ঠ শুনতে পায়নি সবাই, তবুও যার ছন্দ চিরকাল বাজবে আইপিএলের হ্যাটট্রিক-গাথায়, কিংবা বাংলাদেশের এক গ্রীষ্মের দিনে নাইটওয়াচম্যানের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link