ভারত টি-টোয়েন্টি দলের কথা ভাবলেই সবার আগে যে নামটা আসে তিনি অভিষেক শর্মা। নির্ভীক ব্যাটিংয়ে দিনে দিনে নিজেকে পরিণত করেছেন পাওয়ার প্লের দানব হিসেবে। প্রায় ১৯৫ স্ট্রাইক রেটে রান তোলার দক্ষতায় তিনি এখন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর ওপেনার। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন মিডল অর্ডার ব্যাটার।
সালটা ২০১৮, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী ভারতের দলে জায়গা করে আলোচনায় আসেন অভিষেক। সেই দলে তাঁর ভূমিকা ছিল মিডল অর্ডার ব্যাটার হিসেবে। একই বছর দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে(আইপিএল) অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম ম্যাচেই অপরাজিত ৪৬ রান করে ঝলক দেখালেও এরপর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। আসরজুড়ে তিন ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৬৩ রান।
পরের বছর পাড়ি জমান সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ। তবে দল পরিবর্তনের পরও ভাগ্য ফেরেনি। মাঝে মাঝে বোলিংয়ে অবদান রাখলেও ব্যাট হাতে ছিলেন নিষ্প্রভ। সে বছর করেছিলেন মাত্র ৯ রান, এমনকি পরের বছর অর্থাৎ ২০২০ মৌসুমেও করেন ৭১ রান—এমন হতাশাজনক পরিসংখ্যান অনেকটা আলোচনার বাইরে নিয়ে যায় তাঁকে।

তবে হায়দ্রাবাদ হাল ছেড়ে দেয়নি। অভিষেককে নিয়ে আসে এক ভিন্ন ভূমিকায়, ২০২১ আসরে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ওপেনার হিসেবে। তবে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি এবারও। আসর শেষে ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ১৬.৩৩। তবুও ম্যানেজমেন্ট অভিষেকের উপরে ইনভেস্ট করতে থাকে। পরের আসরে কিছুটা উন্নতি দেখা যায় ব্যাটে। ৩০ গড় আর ১৩৩ স্ট্রাইক রেটে ১৪ ম্যাচে করেন ৪২৬ রান।
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদানটা অভিষেক দিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে ছন্দ ফিরে পান, ব্যাটিংয়ে আসে ধারাবাহিকতা। ২০২৩ সালে ২২৬ রান করলেও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে নজর কাড়েন। এরপর আসে ২০২৪ সাল, যেখানে ট্রাভিস হেডের সঙ্গে ওপেনিং জুটি গড়ে রীতিমতো আগুন ঝরান। পুরো মৌসুমে ২০৪ স্ট্রাইক রেটে ৪৮৪ রান করেন অভিষেক। সেই জুটি দলকে নিয়ে যায় আইপিএলের ফাইনালে, যদিও শেষ পর্যন্ত হারতে হয় কলকাতা নাইট রাইডার্সের কাছে।
এরপর থেকেই অন্য এক অভিষেকের আবির্ভাব হয়, যে কোন কিছুর পরোয়া করে না, প্রতিপক্ষের ঘুম হারাম করে দিতে সিদ্ধহস্ত। এই রূপান্তরই তাকে খুলে দেয় জাতীয় দলের দরজা। ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি অভিষেকের পর মাত্র ২১ ইনিংসে তিনি করেছেন ৭৮৩ রান। স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৯৮, যেখানে আছে দুইটি সেঞ্চুরি ও চারটি ফিফটি। আইপিএল ২০২৫ এর মৌসুমেও দেখিয়েছেন নিজের সক্ষমতা। ১৪ কোটি রুপিতে হায়দ্রাবাদ তাঁকে ধরে রেখেছিল। আর অভিষেক এবারও আশাহত করেননি। ১৯৪ স্ট্রাইক রেটে নামের পাশে যোগ করেছিলেন ৪৩৯ রান।

অভিষেকের পরিসংখ্যান বলছে, মিডল অর্ডারে তিনি ছিলেন একেবারেই গড়পড়তা। ২০ ইনিংসে করেছিলেন ২২৮ রান, গড় ছিল ১৫.২। অথচ ওপেনার হিসেবে তার রেকর্ড অনবদ্য—৫১ ইনিংসে করেছেন ১৪৯১ রান, গড় ২৯.৮২ আর স্ট্রাইক রেট ১৬৫.৬৭। আর এখন তো টি-টোয়েন্টির নম্বর ওয়ান তকমা পেয়েছেন নিজের নামের পাশে।
অভিষেক শর্মার এই উত্থান তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের সাফল্য নয়, বরং একটি দলের আস্থার গল্প। সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ তাকে সময় দিয়েছে, ভরসা রেখেছে। আর সেই আস্থা থেকেই জন্ম নিয়েছে ভারতের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের নতুন ওপেনিং সেনসেশন।











