অনর্থক উদাপনের মধ্যবিত্ত মানসিকতা

পিছিয়ে বাংলাদেশ, জয় চাই, কিন্তু দলের জয়ের চাইতেও বড় হয়ে দাড়িয়েছিল ব্যক্তিগত উদযাপন। আর এখানেই বরং ফুটে ওঠে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মানসিকতা। 

কানায় কানায় পূর্ণ দু’টি স্টেডিয়াম। উচ্ছ্বাসের ফুটন্ত তেলে তখন টগবগ করছে স্নায়ুচাপ। পিছিয়ে বাংলাদেশ, জয় চাই, কিন্তু দলের জয়ের চাইতেও বড় হয়ে দাড়িয়েছিল ব্যক্তিগত উদযাপন। আর এখানেই বরং ফুটে ওঠে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মানসিকতা।

ঘরের মাঠে বাংলাদেশ পিছিয়ে ৩-১ গোলে। এমন ম্যাচে শেখ মোরসালিন গোল করলেন। ছুটে গিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বহু প্রচলিত ‘সিউ’ সেলিব্রেশনের অনুকরণ করলেন। তখনও কিন্তু বাংলাদেশ ৩-২ গোলে পিছিয়ে। জয় তো দূরের কথা, পরাজয় এড়ানোও তখন ছিল অনিশ্চিত।

তবে সেখানেই শেষ নয়। হংকংয়ের মাঠে গিয়ে বাংলাদেশ ড্র করল। ম্যাচের ৮৪ মিনিটের মাথায় ফাহমিদুলের হেড থেকে রীতিমত উড়ে এসে গোল করেন রাকিব হোসেন। তিনিও ছুটে যান মাঠের পাশে থাকা ইলেক্ট্রিক বিজ্ঞাপন বোর্ডে। বসলেন সেখানে, আবারও ফিরিয়ে আনতে চাইলেন যেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। বাংলাদেশ স্রেফ সমতায় ফিরেছিল, অথচ সেই ম্যাচে তাদের জিততেই হতো।

এই দু’টো ঘটনার আবার ভিন্ন গল্পও আছে। মোরসালিন যখন উদযাপনে ব্যস্ত, তখন সামিত সোম জালের ভেতর থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে সেন্টার পয়েন্টে রেখেছেন। অন্যদিকে রাকিব যখন উদযাপনে মত্ত তখন হামজা চৌধুরী বল কুড়িয়ে দৌড় শুরু করেন সেন্টার সার্কেলের দিকে। কারণ স্পষ্ট, দু’টো ম্যাচেই তারা দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ফলাফলটাই চেয়েছেন। অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যাননি।

এই ঘটনার বৈপরীত্যই বরং ভিন্ন পরিবেশে মানসিক বিকাশের একটা তুলনামূলক চিত্র অঙ্কন করে দিচ্ছে। এখানে দলের জয় মুখ্য নয়, এখানে ব্যক্তির উপর আসা ক্ষণিকের স্পটলাইট হয়ে যায় সবকিছু। রাকিব-মোরসালিনরা সেই মুহূর্তে নিজেদের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভাবতে শুরু করেন।

কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হয়ে ওঠার পেছনের দর্শনকে তারা অনুসরণ করেন না। এক ঝলক আলোক রোশনাইতে তাদেরকে মনে হয় চাঁদ, কিন্তু তারা নিজেদের সূর্যই ভেবে বসেন। শুধু যে ফুটবলেই এমন মানসিকতার চিত্র ফুটে উঠেছে এবারই প্রথম, তাও কিন্তু নয়। ক্রিকেটেও এমন দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়েছিলেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে তার বুনো উল্লাস নিয়ে তো এখনও ট্রল হয়, নানান ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিওতে ব্যবহৃত হয়। সেদিন জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন বলেই উল্লাস করেছিলেন মুশফিক। কিন্তু শেষ অবধি আর জয় পায়নি বাংলাদেশ। জয় ও জয়ের কাছাকাছির মধ্যে ব্যবধান ঠিক কতটুকু, তা নিশ্চয়ই সেদিনই টের পেয়েছিলেন মুশফিক।

এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের মানুষদের সামগ্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এই তল্লাটে মানুষ অল্পতেই তুষ্ট। তাইতো তারা বিশ্বকাপ জেতে না ক্রিকেটে, তাইতো তারা ফুটবলের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াকে এখনও আকাশ-কুসুম স্বপ্নভাবে। অথচ পাঁচ লাখ জনসংখ্যার কেপ ভার্দে ঠিকই চলে যায় দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে।

লেখক পরিচিতি

রাকিব হোসেন রুম্মান

কর্পোরেট কেরানি না হয়ে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ভাসতে চেয়েছিলাম..

Share via
Copy link