১১ ওভার শেষে রাজশাহীর স্কোরবোর্ডে তখন ভেসে উঠছে ভয় ধরানো এক ছবি—৮০/৫। মিরপুরের ট্রিকি উইকেটে ম্যাচ কার্যত হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম। চাপ এতটাই তীব্র যে, একটু বেপরোয়া হলেও ১৩০ রানও ছোঁয়া কঠিন, আবার অতিরিক্ত সাবধান হলে শেষমেশ ১৪০–১৪৫, যেটা এই উইকেটে মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়।
ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ক্রিজের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন উইলিয়ামসন—১১ বলে ১১ রান, স্কোরকার্ডে খুব সাধারণ, কিন্তু ম্যাচের ভেতরে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এক উপস্থিতি। খেলাটা যখন মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে, তখন তাঁর উপস্থিতি ভিষণ জরুরী ছিল।
এই মুহূর্তে দলের দরকার ছিল না ঝাঁপিয়ে পড়া কোনো বিধ্বংসী ইনিংস, দরকার ছিল সময়কে সঙ্গে নিয়ে এগোনো, রানরেটকে বাঁচিয়ে রাখা, উইকেটকে আগলে রাখা। আর এখানেই বোঝা যায় উইলিয়ামসনদের ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় জুড়ে কেন বলা হয় তারা বিশ্বসেরা ‘অ্যাঙ্কর’। অ্যাঙ্কর মানে শুধু বল ঠেকিয়ে রাখা নয়, শেষে গিয়ে মারার অপেক্ষা করাও নয়। অ্যাঙ্করের কাজ হল—রিস্ক না নিয়ে ম্যাচটাকে গভীরে নিয়ে যাওয়া, এমনভাবে যে রানরেট কখনোই শ্বাসরোধকারী হয়ে না ওঠে।

উইলিয়ামসনের ব্যাটিংটা তখন চোখে পড়ছিল খুব সূক্ষ্মভাবে। খুব বেশি গতিতে না হলেও রান বাড়ছিল। ১৫ বলে ১৫ হওয়ার পর একটা বল আলতো করে ব্যাটে ছুঁইয়ে মুহূর্তের মধ্যে দৌড়ে ডাবল। ফিল্ডার বল ধরছে, থ্রো করছে—আর ততক্ষণে দুই রান নিশ্চিত।
পরের বলেও একই ছবি, একই টাচ আর সেই একই ক্ষিপ্রতা। তখন মনে হচ্ছিল, আচ্ছা, এই কারণেই তো উইলিয়ামসন আলাদা! কোনো রিস্ক নেই, কোনো অহেতুক হিরোইজম নেই—শুধু সিঙ্গেল, ডাবল আর মাঝেমধ্যে প্রয়োজনমতো বাউন্ডারি। এইভাবেই তো তারা ধুঁকতে থাকা ইনিংসকে টেনে নিয়ে যায় নিরাপদ জায়গায়।
এই ইনিংসের আরেকটা বড় দিক ছিল সতীর্থের উপর অগাধ আস্থা। উইলিয়ামসন জানতেন, অপর প্রান্তে নিশাম আছে। নিশাম যখন সুযোগ পাচ্ছিলেন, তখন বাউন্ডারি হাঁকাচ্ছিলেন। আর উইলিয়ামসন? তিনি তখন একটাও ডট না খেয়ে রানের চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন, রানরেটকে রাখছিলেন হেলদি। তিনি জানেন, ১০০ স্ট্রাইক রেটে খেললেও শেষ দিকে বল আসবে মারার মতো। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।

শেষমেশ রাজশাহী যখন ১৬৫ রানে পৌঁছাল, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়—মিরপুরের এই উইকেটে এটা যথেষ্ট কি না? হয়তো ১০–১৫ রান কমও হতে পারে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার, এই ১৬৫-এর ভিতটা তৈরি হয়েছে উইলিয়ামসনের সেই ক্যালকুলেটিভ, ‘প্রোপার অ্যাঙ্কর’ অ্যাপ্রোচের উপর ভর করেই। তিনি না থাকলে নিশামও হয়তো ওইভাবে হাত খুলে মারার সুযোগ পেতেন না।
এই ইনিংসটা হয়তো চোখ ধাঁধানো নয়, চার-ছক্কার ঝলকানিতে ভরা নয়। বয়স হয়েছে, আগের মতো টাচও হয়তো নেই। কিন্তু বিপদে দলকে একটা লড়াই করার মতো অবস্থানে এনে দেওয়ার জন্য, ম্যাচে একটা প্রোপার চান্স তৈরি করে দেওয়ার জন্য—এটা ছিল একেবারে মাস্টারফুল ইনিংস। আর ঠিক এই ধরনের ইনিংস বুনতে পারেন বলেই কেন উইলিয়ামসনরা বিশ্বসেরা।










