গোলাপি চুলের ঐতিহাসিক উইলোবাজি

চিন্নাস্বামীর ব্যাটিং স্বর্গে সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল, ৩০০ রানের লক্ষ্যও অজেয় নয়। আয়ারল্যান্ড, যারা সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত হতো, তারা দেখিয়ে দিয়েছিল সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

২০১১ সালের ২ মার্চ, বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে ক্রিকেট বিশ্বকাপের মঞ্চে রচিত হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। গোলাপি চুলের এক ব্যাটসম্যান সেদিন একাই ইতিহাস লিখেছিলেন। তিনি কেভিন ও’ব্রায়েন। শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার ব্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছিল ওয়ানডে বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরি—মাত্র ৫০ বলে।

আর সেই ইনিংস ভর করেই আয়ারল্যান্ড গড়ে তোলে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন। নিশ্চয়ই, সেটাই আইরিশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সেরা স্বর্ণালী মুহূর্ত

প্রথমে ব্যাট করে ইংল্যান্ড তোলে ৩২৭ রান। বিশাল এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আয়ারল্যান্ড শুরুতেই ধাক্কা খায়—প্রথম বলেই উইকেট হারায় তারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কোরবোর্ডে ১০৬ রানে ৪ উইকেট, পরে ১১১ রানে ৫ উইকেট। ম্যাচ তখন প্রায় একতরফা বলেই মনে হচ্ছিল।

ঠিক সেই সময় ক্রিজে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন কেভিন ও’ব্রায়েন। ইংলিশ বোলারদের ওপর ঝড় বইয়ে দেন তিনি। একের পর এক বাউন্ডারি আর ছক্কায় চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। মাত্র ৫০ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে তিনি ভেঙে দেন আগের রেকর্ড, যা ছিল অস্ট্রেলিয়ার ম্যাথু হেইডেনের। ২০০৭ বিশ্বকাপে ৬৬ বলে সেঞ্চুরি করেন হেইডেন।

ও’ব্রায়েন শেষ পর্যন্ত ৬৩ বলে ১১৩ রান করেন, যার মধ্যে ছিল ১৩টি চার ও ৬টি ছক্কা। অ্যালেক্স কুসাকের সঙ্গে তার ১৬২ রানের জুটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি আউট হওয়ার পরও আয়ারল্যান্ডের দরকার ছিল শেষ ১০ বলে ১১ রান। জন মুনি ৫০তম ওভারের প্রথম বলেই জেমস অ্যান্ডারসনের বলে মিডউইকেট দিয়ে চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন।

এই জয়ের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ড শুধু ইংল্যান্ডকে তিন উইকেটে হারায়নি, গড়ে তোলে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ সফল রানতাড়ার রেকর্ডও। এর আগে ১৯৯২ সালে শ্রীলঙ্কা ৩১৩ রান তাড়া করে জিতেছিল।

এর আগে ইংল্যান্ডের ইনিংসে জনাথন ট্রট ৯২ রান করে দ্রুততম এক হাজার ওয়ানডে রানের রেকর্ডে ভিভিয়ান রিচার্ডস ও কেভিন পিটারসেনের পাশে নাম লেখান—মাত্র ২১ ইনিংসে এই মাইলফলক স্পর্শ করে। ট্রট ও ইয়ান বেলের ১৬৭ রানের জুটি ইংল্যান্ডকে বড় সংগ্রহ এনে দেয়। কিন্তু সেই রানও নিরাপদ প্রমাণিত হয়নি।

চিন্নাস্বামীর ব্যাটিং স্বর্গে সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল, ৩০০ রানের লক্ষ্যও অজেয় নয়। আয়ারল্যান্ড, যারা সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত হতো, তারা দেখিয়ে দিয়েছিল সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন একাই—কেভিন ও’ব্রায়েন। তার ব্যাট থেকে বের হওয়া সেই ৫০ বলের সেঞ্চুরি আজও বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে টিকে আছে।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link