ক্রিকেট মানচিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তারা হয়ে ওঠেন একেকটি আবেগ। তেমনই এক নাম শাহিবজাদা মোহাম্মদ শহীদ খান আফ্রিদি। কেউ তাকে বলেন ‘বুম বুম’, কেউবা ডাকেন ‘লালা’। আজ যখন আধুনিক ক্রিকেটে ‘পাওয়ার হিটিং’ বা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যাকরণ নিয়ে আলোচনা হয়, তখন অজান্তেই আমাদের স্মৃতি ফিরে যায় ক্রিকেটের জার্সি নাম্বার ‘টেন’ এর কাছে।
পাকিস্তানের শিয়ালকোট – যে শহর বিখ্যাত তার বিশ্বসেরা ক্রিকেটের ব্যাটের জন্য। সেখানেই একবার কিংবদন্তি ওয়াকার ইউনুস গিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকারের জন্য একটি নিখুঁত ব্যাটের প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে। কে জানত, সেই ব্যাটটিই একদিন বদলে দেবে ক্রিকেটের ইতিহাস? ১৬ বছরের এক কিশোরের হাতে যখন সেই ব্যাটটি উঠল, তখন ক্রিকেট বিশ্ব হয়তো ভাবতেও পারেনি কী তুফান আসতে চলেছে।
১৯৯৬ সাল, নাইরোবির আকাশে রোদ। মুশতাক আহমেদের ইনজুরিতে দলে সুযোগ পাওয়া সেই লেগ স্পিনার ব্যাটিং করতে নামলেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। কোনো ভয় নেই, কোনো জড়তা নেই, কেবল আছে বল সীমানার ওপারে পাঠানোর এক অদম্য জেদ। মাত্র ৩৭ বলে ১১টি দানবীয় ছক্কায় যখন তিনি সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন, তখন জন্ম নিল এক নতুন বিপ্লব। আজও সেই ইনিংসটি ক্রিকেটের নস্টালজিয়ায় এক অমর অধ্যায় হয়ে আছে।

টেস্ট ক্রিকেটে আফ্রিদির পথচলা হয়তো দীর্ঘ হয়নি, কিন্তু সেখানেও তিনি ছাপ রেখেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ উইকেট কিংবা ভারতের মাটিতে ১৪১ রানের সেই বিধ্বংসী ইনিংস দিয়ে প্রমাণ করেছিল তিনি সব ফরম্যাটেই উজ্জ্বল। কিন্তু রঙিন পোশাকে আফ্রিদি যেন ছিলেন একচ্ছত্র সম্রাট। ৯৯টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১৪১৬ রান আর ৯৮টি উইকেট, এই পরিসংখ্যানটুকু কেবল সংখ্যামাত্র। মাঠের প্রতিটি মুহূর্তে তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের মনে যে ত্রাস সৃষ্টি করত, তা অতুলনীয়।
আফ্রিদির বয়স নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে কৌতুকের শেষ ছিল না। কিন্তু ৪৭ বছর বয়সেও যখন তাকে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে বল হাতে তেড়ে আসতে বা ব্যাটে ঝড় তুলতে দেখা গেছে, তখন বয়স কেবলই একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। পশতুন রক্তের সেই তেজ আর খাইবার সীমান্তের লড়াকু মানসিকতা তাকে বুড়ো হতে দেয়নি কখনো।
শহীদ আফ্রিদি কেবল একজন ক্রিকেটার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অবাধ্য হাহাকার। মাঠের ভেতর তিনি যেমন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠতেন, মাঠের বাইরে তেমনই ছিলেন শরতের মেঘের মতো শান্ত। ক্যারিয়ারজুড়ে কতবার যে তিনি ‘বিদায়’ বলে আবার ফিরে এসেছেন, তার হিসেব হয়তো পরিসংখ্যানবিদরাও গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্রিকেট পাগল এই মানুষটি আসলে কোনোদিন মাঠ ছাড়তেই চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ২২ গজের এই মায়াজালে চিরকাল বন্দি থাকতে।











