জীবনটাই তাঁর একটা মিরাকল। কে ভেবেছিল গ্রোথ হরমোনে ভোগা সেই ক্ষুদে ছেলেটাই নজরে আসবেন বার্সেলোনার স্কাউটদের। কে ভেবেছিল এক টিস্যু পেপারের কনট্রাক্ট তাঁকে নিয়ে যাবে লা লিগার মঞ্চে। ১৯ বছর বয়সেই তাঁর নামের পাশে গোল অব দ্য সেঞ্চুরি লেখা হবে, কে জানতো ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে তিনি উঠবেন নবাগত ফুটবল বিস্ময়।
ক্যাম্প ন্যু’র যারা ওই সময় যারা তাঁকে দেখেছেন, তাঁদের জন্য এটা ছিল মিরাকল। বার্নাব্যুতে রামোসদের ট্যাকলে রক্তাক্ত পা নিয়েও তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, ষাড়ের মত আঘাত সহ্য করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ডেডলি! পুরো পৃথিবী দেখেছে দ্য কোল্ডেস্ট স্লো ওয়াক! দ্যাট ওয়াজ আ মিরাকল।
কচি কাচার আসর নিয়েও তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপ গিয়েছিলেন। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের পর বিশ্ব যখন আর্জেন্টিনার বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন – বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা। কথা রেখে তিনি দলকে ফিরিয়ে এনেছিলেন খাদের কিনারা থেকে। আর্জেন্টিনা ঠিকই বিশ্বকাপ জিতেছিল। মেসি ঠিকই মিরাকল গড়েছিলেন। কারণ লিওনেল মেসির জীবনটাই একটা মিরাকল।
রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ ফুটবল সিংহাসনের শিখরে। যার বাঁ পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়ে থেকেছে গোটা বিশ্ব, সেই লিওনেল মেসি জিতে নিয়েছেন সম্ভাব্য সব শিরোপা। ফুটবলে এমন কোনো অর্জন নেই যা তাঁর আয়ত্তের বাইরে থেকে গেছে। তবুও ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি আবারও নামছেন শেষবারের মতো। সেই শেষ লড়াইয়েও যে কোনো মিরাকল আসবে না কে জানে!

৩৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কাতার বিশ্বকাপে আলবিসেলেস্তেদের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন সত্যি করেছিলেন তিনি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যেন ফুটবল নিজেই পূর্ণতা পেয়েছিল তাঁর হাতে।
এখন আর তাঁর কোনো অপ্রাপ্তি নেই, নেই কোনো পাওয়ার তাগিদ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে ফুটবল নামক শিল্পটাকে কেবল উপভোগ করতেই তাঁর এই শেষ রণসজ্জা। আর মেসি যখন রণসজ্জা নেন, তখন তাতে মিরাকল আসতে বাধ্য।
আর্জেন্টিনা দলও এখন উড়ছে সাফল্যের আকাশে। সর্বশেষ দুই কোপা আমেরিকা আর ফিনেলিসিমা জিতে নিজেদের অপরাজেয় প্রমাণ করেছে। তবে এবারের মিশনটা লাতিন আমেরিকার দেশটির জন্য একটু ভিন্ন, কারণ, এবার হুলিয়ান আলভারেজরা খেলতে নামবেন তাঁদের প্রিয় অধিনায়কের বিদায়টাকে রাজকীয় করার জন্য। রাজার বিদায়েও কি অভাবনীয় হবে না?
মেসির জন্য এখন আর মাঠের লড়াইটা স্রেফ জেতার নয়, বরং ক্যানভাসে শেষবারের মতো তুলির আঁচড় কাটার। যেখানে মাথায় কোনো চাপ নেই, আছে শুধু বিশুদ্ধ আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের চোখ তাই আবারও আটকে থাকবে মেসির সেই চেনা ড্রিবলিং আর জাদুকরী পাসিংয়ের দিকে।

ফুটবলকে তিনি যা দিয়েছেন, ফুটবল হয়তো তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে তার চেয়েও বেশি। কিন্তু বুটজোড়া তুলে রাখার আগে ভক্তদের মনে আরও কিছু সোনালী স্মৃতি জমা করতে চান এই মহাতারকা। এক বুক ভালোবাসা আর শূন্য প্রত্যাশা নিয়ে তাই তিনি সবুজ গালিচায় বুনে চলেছেন এক রূপকথা।
দলগতভাবে আর্জেন্টিনা জানপ্রাণ লড়ে যাবে নিজেদের মহানায়কের শেষ বিশ্বকাপকে রাঙিয়ে দিতে। মেসির হাতে আরও একবার সোনালী শিরোপা দেখার চেয়েও, দলের লক্ষ্য থাকবে তাঁর মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফোটানো। কারণ ফুটবল বিশ্ব জানে, এমন জাদুকর আর কখনো জন্মাবে না এই চেনা সবুজ ঘাসের মাঠে।
আসুন তবে, সব হিসাব-নিকাশ ভুলে আমরা উপভোগ করি এই শেষ যাত্রা। কোনো চাপ ছাড়া, মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলে মেসি যখন শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মাঠে দৌড়াবেন, তখন জয়-পরাজয় ছাপিয়ে বিজয় হবে ফুটবলের সুন্দরের।

এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে, আরও একটা মিরাকলের অপেক্ষায় আছে ফুটবল বিশ্ব। যখন মেসি থাকেন মাঠে তখন যেকোনো মিরাকলই ঘটতে পারে, কারণ খোদ ফুটবল ঈশ্বরের হাত আছে মেসির মাথায়। নাকি এই মেসিই ফুটবলের ঈশ্বর?










