ভাবতে পারেন, একটা সময় ভারত-পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটের সেরা দলগুলো নিয়মিত একে অপরের মুখোমুখি হতো! আজ যেখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই দুই দেশের লড়াই বিরল, সেখানে একসময় রঞ্জি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন আর কায়েদ-ই-আজম ট্রফি জয়ীরা নামত একই মাঠে। ব্যাটে-বলে জমত উপমহাদেশের সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
ভারত-পাকিস্তানকে তখন ক্রিকেট মাঠে এক করে রেখেছিল মোহাম্মদ নিসার ট্রফি। একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচের মধ্য নিয়ে নির্বাচিত হত চ্যাম্পিয়ন দল। দু’টি ভিন্ন দেশের ঘরোয়া দু’টি দলের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। ক্রিকেট ইতিহাসে এই ধারণাটাই একেবারে বিরল। সেখানে দলগুলো যখন ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসত, তখন এর মর্যাদা বেড়ে যেত বহুগুণে।
ক্রিকেট ইতিহাসের এক বিস্মৃত অথচ রোমাঞ্চকর অধ্যায় এই টুর্নামেন্ট। যার নামকরণ হয়েছিল মোহাম্মদ নিসারের নামে। বর্তমান পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি পেসার ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে টেস্ট ক্রিকেট খেলেছিলেন। ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার আগের সেই ইতিহাস যেন প্রতীক হয়ে ছিল এই ট্রফির।
মূলত ভারতের রঞ্জি ট্রফি এবং পাকিস্তানের কায়েদ-ই-আজম ট্রফির সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে আয়োজন করা হতো এই প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ দুই দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সেরা দলগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।

২০০৬ সালে প্রথম আসরে মুখোমুখি হয়েছিল উত্তর প্রদেশ ও শিয়ালকোট। সেই ম্যাচে জয় পেয়েছিল উত্তর প্রদেশ। তবে শুধু ফল নয়, সেই লড়াইয়ে ছিল ভবিষ্যতের অনেক তারকার উপস্থিতি। উত্তর প্রদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুরেশ রায়না। অন্যদিকে শিয়ালকোট দলে ছিলেন ইমরান নাজির, মোহাম্মদ আসিফ ও শোয়েব মালিকের মতো ক্রিকেটাররা।
বিশেষ করে ইমরান নাজিরের ব্যাটিং ছিল বিধ্বংসী। মাত্র ১১৫ বলে খেলেছিলেন ১২৩ রানের ইনিংস। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের চিরচেনা আগ্রাসন আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ঘরোয়া ক্রিকেটেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
২০০৭ সালে দ্বিতীয় আসরে মুম্বাইয়ের প্রতিপক্ষ ছিল করাচি আরবান। সেই ম্যাচে মুম্বাই জয় পেলেও আলোচনায় উঠে এসেছিলেন এক তরুণ ব্যাটার— আজিঙ্কা রাহানে। ভবিষ্যতে যিনি ভারতের টেস্ট দলের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তবে ২০০৮ সালের আসর যেন ছিল তারকাদের মহামিলন। দিল্লি বনাম সুই নর্দার্ন গ্যাস পাইপলাইনসের সেই ম্যাচে মাঠ ভাগ করেছিলেন বীরেন্দ্র শেবাগ, বিরাট কোহলি, আশিস নেহরা, ইশান্ত শর্মা, মোহাম্মদ হাফিজ, উমর আকমল ও মিসবাহ-উল-হকের মতো তারকারা।

আর সেই ম্যাচেই জন্ম নিয়েছিল এক ঐতিহাসিক ইনিংস। দিল্লির দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৯ বছর বয়সী বিরাট কোহলি খেলেছিলেন ১৯৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। সেটিই ছিল তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ স্কোর, যা অটুট ছিল ২০১৬ সালে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করার আগ পর্যন্ত।
মজার ব্যাপার হলো, ২০০৮ সালে সুই নর্দার্ন গ্যাস পাইপলাইনস দিল্লিকে হারিয়ে প্রথম পাকিস্তানি দল হিসেবে জিতেছিল মোহাম্মদ নিসার ট্রফি।
কিন্তু সময় বদলেছে। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ক্রিকেটের দরজাতেও তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ মানেই সীমিত কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ঘরোয়া ক্রিকেটের সেই আন্তঃদেশীয় লড়াই আজ শুধুই স্মৃতি।
তবু মোহাম্মদ নিসার ট্রফির গল্প শুনলে মনে হয়, ক্রিকেট একসময় সীমান্তের দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিল। একই মাঠে ভারত-পাকিস্তানের তরুণ তারকারা লড়েছেন, বন্ধুত্ব করেছেন, ইতিহাস লিখেছেন। আর সেই ইতিহাস এখন যেন এক হারিয়ে যাওয়া ক্রিকেট-রূপকথা।











