সৌরভ গাঙ্গুলী: ভারতীয় ক্রিকেটের আগ্রাসী রূপকার

সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতকে স্রেফ প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে খেলতে শেখাননি। বরং, তিনি পুরো দলের মননে জেতার ক্ষুধাকে পরিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাতেই একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ২২ গজের লড়াইয়ে ভারত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে অনমনীয় এক অবস্থান!

২০০০ সাল। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কেলেঙ্কারি আর বিদেশের মাটিতে টানা পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে তখন অস্বস্তিতে ভারতীয় ক্রিকেট। এমন সময় আগমন ঘটল এক ত্রাতার। অধিনায়ক হিসেবে দলের হাল ধরলেন দলের অভিজ্ঞ ব্যাটার সৌরভ গাঙ্গুলী। ব্যস! তারপর মুহূর্তেই হারিয়ে যাওয়া আস্থা আর মনোবল ফিরিয়ে এনে তিনি দলকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়।

স্কিপার হয়ে প্রথমেই রক্ষণাত্মকভাবে খেলার ভীরু মানসিকতা গুঁড়িয়ে দিয়ে সৌরভ ভারত দলে রোপিত করেন সাহসী আগ্রাসনের বীজ। এতে বিশ্বমঞ্চে প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার এক লড়াকু মানসিকতা জন্ম নেয় প্রতিটি ভারতীয় খেলোয়াড়ের মধ্যে।

সৌরভের নেতৃত্বে বিদেশের মাটিতে হারের বৃত্তও ভেঙে দেয় দলটি। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বৈরী কন্ডিশনে বুক চিতিয়ে জয় ছিনিয়ে আনাই হয়ে ওঠে ম্যান ইন ব্লুজদের একমাত্র লক্ষ্য। বিদেশের মাটিতে ১১টি টেস্ট জয় সৌরভ গাঙ্গুলীকে সেকালের সেরা ওভারসিজ অধিনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর অনন্য নেতৃত্ব গুণে ২০০৩-০৪ মৌসুমে পাকিস্তানের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় ভারত।

লর্ডসেও ২০১০ সালে ন্যাটওয়েস্ট ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিতে ভারতীয়দের গৌরব বাড়িয়ে দেন তিনি। সেই ম্যাচ জেতার পর তিনি শার্ট খুলে বুনো উল্লাস করে জানান দেন ক্রিকেট বিশ্বে ভারতীয় আধিপত্যের সূচনা হয়েছে! এছাড়া, ২০০১ সালে ইডেন গার্ডেনে তাঁর নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে পরাজিত করে ভারত। তখন পর্যন্ত টেস্টে অজিদের বিপক্ষে এটি ছিল ম্যান ইন ব্লুজদের মাত্র তৃতীয় জয়!

গাঙ্গুলী শুধু ভারতকে জেতাননি, তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ সুসংহত করার ভারও বয়েছেন ঢের! জহির খান, যুবরাজ সিং, হরভজন সিং, বীরেন্দর শেবাগ এবং মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো অনভিজ্ঞ তরুণ প্রতিভাদের তিনি নিজে বেছে বেছে সমর্থন করেছেন। সাথে পথ বাতলে দিয়েছেন কীভাবে চাপের মুখে দলের হাল ধরে রাখতে হয় দৃঢ়ভাবে, সেটার!

তাঁর অধীনে ১৪৬টি ওয়ানডে ম্যাচের মধ্যে ৭৬টিতে জয় পায় ভারত। হার ৬৫টি ম্যাচে। সৌরভের অর্জনের মধ্যে অন্যতম ছিল ২০০২ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় এবং ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতকে রানার্স-আপ বানানো। পাশাপাশি, গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে ৪৯ টেস্ট খেলে ২১টিতে জয় পায় টিম ইন্ডিয়া। এমন নজির খুব কম সংখ্যক ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেনই গড়তে পেরেছেন তখন পর্যন্ত। ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে তাই, সৌরভ গাঙ্গুলীর এই দেখিয়ে দেওয়া পথে চলেই ভারতীয় দল আজ বিশ্বমঞ্চে দৃঢ় ক্রিকেটীয় পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতকে স্রেফ প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে খেলতে শেখাননি। বরং, তিনি পুরো দলের মননে জেতার ক্ষুধাকে পরিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাতেই একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ২২ গজের লড়াইয়ে ভারত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে অনমনীয় এক অবস্থান!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link