পরিসংখ্যানের খাতায় ভিভিএস লক্ষ্মণকে মাপতে গেলে বড় ভুল হবে। ৮,৭৮১ টেস্ট রান কিংবা ১৭টি সেঞ্চুরি – সংখ্যাগুলো আপাতদৃষ্টিতে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের জন্য কেবল ‘ভালো’ মনে হতে পারে, কিন্তু ‘স্পেশাল’ নয়। তবে লক্ষ্মণ নামের ধাঁধাটি রানের সংখ্যায় লুকিয়ে ছিল না, ছিল তাঁর রানের প্রভাব এবং পরিস্থিতি জয়ের ক্ষমতায়।
ভিভিএস লক্ষ্মণের আদ্যক্ষর ‘ভিভিএস’ কে বিশ্বক্রিকেট ভালোবেসে রূপান্তর করেছিল ‘ভেরি ভেরি স্পেশাল’-এ। কিন্তু কীভাবে ব্যাকফুটের ফ্লিক আর নান্দনিক শটে একজন ব্যাটসম্যান হয়ে উঠলেন ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম ‘স্পেশাল’ চরিত্র?
লক্ষ্মণের ‘ভেরি ভেরি স্পেশাল’ হয়ে ওঠার প্রথম কারণ, তিনি সেরা ফর্মের সেরা প্রতিপক্ষকে বেছে নিয়েছিলেন। আশির দশকের পর বিশ্বক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার যে অলিন্দ আধিপত্য ছিল, তাকে একা হাতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন তিনি।

তাঁর ১৭টি সেঞ্চুরির ছয়টিই এসেছে অজিদের বিপক্ষে। গ্লেন ম্যাকগ্রা বা শেন ওয়ার্ন যখন যেকোনো ব্যাটিং লাইন আপকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন, লক্ষ্মণ তখন অফ স্ট্যাম্পের কোয়ার্টার ইঞ্চি বাইরের বলকেও অনসাইডে সীমানা ছাড়া করতেন অবলীলায়।
লক্ষ্মণকে ক্রিকেটের ইতিহাসে অমরত্ব দিয়েছে ২০০১ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলা ২৮১ রানের সেই ঐতিহাসিক ইনিংসটি। ফলো অনের লজ্জায় পড়ে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে স্টিভ ওয়্যার অশ্বমেধের ঘোড়াকে থামিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা কিংবা জেসন গিলেস্পিদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ড্রাইভ, কাট আর ফ্লিকের যে প্রদর্শনী তিনি দেখিয়েছিলেন, তা কেবল ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসকেই বদলে দেয়নি, বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের গতিপথই ঘুড়িয়ে দিয়েছিল।

টপ অর্ডারে শচীন, দ্রাবিড় বা গাঙ্গুলী রান করে ভিত্তি গড়ে দিতেন। কিন্তু টপ অর্ডার ভেঙে পড়লে কিংবা লেজের সারির ব্যাটসম্যানদের নিয়ে শেষ উইকেটে ম্যাচ জেতানোর দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নিতেন লক্ষ্মণ। ২০১০ সালে মোহালিতে ভাঙা পিঠ আর মারাত্মক ব্যথা নিয়ে নয় নম্বর ব্যাটসম্যান প্রজ্ঞান ওঝাকে সাথে নিয়ে এক উইকেটের সেই মহাকাব্যিক জয়! তাঁর ব্যাটিংয়ের চেয়েও বেশি প্রকাশ করে তাঁর লৌহকঠিন মানসিকতা।
লক্ষ্মণের ব্যাটিং শৈলীর মূল রহস্য নিহিত ছিল তাঁর অলৌকিক বলীয়সী কব্জিতে। অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরের বলকে যেভাবে তিনি চোখের পলকে অন সাইডে ফ্লিক করে সীমানা ছাড়া করতেন, তা কেবল টেকনিক দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ওটা ছিল স্রেফ জাদুকরী নান্দনিকতা। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের পর হায়দরাবাদী ব্যাটিং ঘরানার সেই নিখাদ ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে লক্ষ্মণ নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য এক উচ্চতায়।
ভিভিএস লক্ষ্মণ রান করার জন্য খেলেননি, তিনি খেলেছেন ম্যাচ জেতানো আর ইতিহাস বদলের জন্য। ক্রিকেটের ইতিহাসে অনেক রান সংগ্রাহক আসবেন, কিন্তু চরম বিপর্যয়ে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এমন ঠাণ্ডা মাথায় গল্প বদলে দেওয়া খেলোয়াড় একজনই ছিলেন।












