২২ গজের অটল দেয়াল যিনি

রাহুল দ্রাবিড় কেবল দুর্দান্ত একজন ব্যাটার নন। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে মনোবলকে শক্ত রেখে সংগ্রামে লিপ্ত থাকার দৃঢ় এক প্রেরণা। প্রতিপক্ষের ক্ষুরধার বোলিং আক্রমণের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য কাণ্ডারি যেন তিনি!

ভাবুন তো, উইকেটের একপ্রান্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে একটি দলের ব্যাটিং লাইনআপ। অথচ উইকেটের অন্যপ্রান্ত আগলে দাঁড়িয়ে আছেন এক অনড়, অটল মানুষ। বোলাররা তেড়ে আসছেন, কিন্তু তাঁর ব্যাটের ডিফেন্সে থমকে যাচ্ছে বলের গতি। তিনি আর কেউ নন, রাহুল দ্রাবিড়। কিন্তু গোটা বিশ্ব তাঁকে চেনে ‘দ্য ওয়াল’ বা ‘দেয়াল’ নামে।

কিন্তু কেন দ্রাবিড় ২২ গজের এই দেয়াল তকমা পেলেন? ফ্ল্যাশব্যাক করা যাক্ সেদিকেই!

শুরুটা ১৯৯৬ সালের জুনে। ক্রিকেটের পুণ্যভূমি লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ইংল্যান্ড। সেদিনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তরুণ দ্রাবিড়ের। প্রথম ম্যাচ থেকেই ধারাভাষ্যকার ও দর্শকেরা বুঝে নিয়েছিলেন, এই ছেলেটি সাধারণ নয়। তাঁর মধ্যে ছিল এক অনন্য প্রতিভা। সেটি হলো চরম চাপ মোকাবিলার কঠিন দক্ষতা! পাশাপাশি একপ্রান্ত ধরে রেখে দলের ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যেতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর ব্যাটিংয়ের মূল শক্তি ছিল তাঁর নিখুঁত সব ডিফেন্সিভ স্ট্রোক। পেস বোলিং হোক কিংবা স্পিন, কোনো কিছুই টলাতে পারত না তাঁর দুর্ভেদ্য প্রতিরোধকে।

তবে স্রেফ নৈপুণ্য দিয়ে তো আর ‘দেয়াল’ তকমা পাওয়া যায় না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পথচলা এবং ধৈর্যের এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। সময় যত গড়িয়েছে, রাহুল দ্রাবিড়ের ক্যারিয়ারের গ্রাফও ততই উজ্জ্বল হয়েছে। ঘন্টার পর ঘন্টা ক্রিজে টিকে থেকে চাপের মুখে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দলের জন্য বয়ে এনেছে অসংখ্য স্বস্তি। যেখানে অন্য অনেক ব্যাটার গ্যালারি মাতাতে মারকুটে শট খেলতেন, সেখানে দ্রাবিড় ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর খেলার ধরন আক্রমণাত্মক ছিল না। তাঁর মনোযোগ ছিল নিখুঁত টেকনিকে অদম্য মানসিক শক্তির দৃঢ়তায় শুধু ২২ গজে টিকে থাকার দিকে।

আর এই মানসিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক টেস্টে। যে ম্যাচ ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

সালটা ২০০১। বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে কলকাতায় অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারত তখন খাদের কিনারায়। ফলো-অনে পড়ে ধুঁকছে পুরো ব্যাটিং লাইনআপ। ঠিক তখনই ভিভিএস লক্ষ্মণকে সাথে নিয়ে দেয়াল গড়ে তুললেন রাহুল দ্রাবিড়। তাঁদের ৩৭৬ রানের অনবদ্য জুটি ভারতকে এনে দেয় এক ঐতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য জয়।

দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রাবিড় একাই মোকাবেলা করেন ৩৫০টিরও বেশি ডেলিভারি। অজি বোলারদের ছোঁড়া গোলার মতো ডেলিভারিগুলোকে তিনি প্রতিহত করেন অসাধারণ টেকনিক আর একাগ্রতার মিশেলে। শেষ পর্যন্ত ১৮০ রানের এক নান্দনিক ইনিংস খেলে তিনি দেখিয়ে দেন কেন তাঁকে ‘দ্য ওয়াল’ নামে বাড়াবাড়ি নয় মোটেও!

রাহুল শুধু মাঠেই ভারতের ত্রাতা ছিল না, বরং দলের সামগ্রিক কাঠামোর এক অপরিহার্য ভিত্তি হয়ে উঠেছিলেন। চরম চাপের মুখে অবিচল থাকা এবং সুশৃঙ্খল ব্যাটিং দ্রাবিড়কে ভারতীয় দলের নির্ভরযোগ্য স্তম্ভে পরিণত করেছিল। যেকোনো কঠিন কন্ডিশনে, ভয়ানক বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে তিনি ছিলেন দলের পরম আস্থার প্রতীক।

রাহুল দ্রাবিড় কেবল দুর্দান্ত একজন ব্যাটার নন। তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে মনোবলকে শক্ত রেখে সংগ্রামে লিপ্ত থাকার দৃঢ় এক প্রেরণা। প্রতিপক্ষের ক্ষুরধার বোলিং আক্রমণের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য কাণ্ডারি যেন তিনি!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link