স্বপ্নের কালিতে লেখা ইকুয়েডরের ইতিহাস!

শেষ বাঁশি বাজতেই গঞ্জালো প্লাতা যেন আর পৃথিবীতে ছিলেন না। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, এটা সত্যি? সত্যিই কি তিনি জার্মানির জালে সেই গোলটা করেছেন?

শেষ বাঁশি বাজতেই গঞ্জালো প্লাতা যেন আর পৃথিবীতে ছিলেন না। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, এটা সত্যি? সত্যিই কি তিনি জার্মানির জালে সেই গোলটা করেছেন? যে গোল বদলে দিয়েছে একটি দেশের ফুটবল ইতিহাস?

তিনি হাসছিলেন। আবার যেন কাঁদছিলেনও। উদ্ভ্রান্ত পথিকের মতো এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন। একবার সতীর্থকে জড়িয়ে ধরছেন, আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন। তিনি একা নন, পুরো গ্যালারি কাঁদছে, হাসছে, যা মন চাচ্ছে সেটাই করছে। তারা যে ইতিহাস লিখেছে, তারা যে ঘুমচোখে দেখা স্বপ্ন বাস্তবে ছুঁয়ে দেখেছে।

ইকুয়েডরের সামনে সমীকরণটা বেশ নিষ্ঠুর ছিল। নকআউটে উঠতে হলে হারাতেই হবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে। ড্র নয়, পরাজয় তো নয়ই,   নিস্তেজ শরীরে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে পারে শুধুই একটা জয়। আর সেই অসম্ভব মিশনের শুরুতেই দ্বিতীয় মিনিটে লিরয় সানের গোলে পিছিয়ে পড়ে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। কি মনে হচ্ছিল তখন, স্বপ্ন দেখাটাই বুঝি ভুল? এত বড় দলের বিপক্ষে এত দ্রুত গোল খেয়ে ফিরে আসা কি সম্ভব?

ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। শুধু একটা কিক দরকার, শেষ বাঁশি বাজার আগে শেষ চেষ্টাটা দরকার। প্রথম ধাক্কা সামলে নবম মিনিটেই সমতায় ফেরে ইকুয়েডর। তারপর শুরু হয় বিশ্বাসের লড়াই। প্রতিটি ট্যাকল, দৌড়, কর্নারে যেন একটা জাতির দুই দশকের অপেক্ষা জমা হচ্ছিল। অবশেষে ৭৭ মিনিটে কর্নার থেকে ভেসে আসা বল গোলমুখে পা ছুঁইয়ে জালে পাঠান গঞ্জালো প্লাতা। সেই এক স্পর্শই বদলে দেয় সব হিসাব। বদলে দেয় বিশ্বকাপে ইকুয়েডরের পরিচয়ও।

২০০২ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলেছিল ইকুয়েডর। চার বছর পর ২০০৬ সালে প্রথমবার গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে উঠেছিল নকআউটে। তখন নাম ছিল রাউন্ড অব ১৬। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ বিশ বছর। প্রজন্ম বদলেছে, কোচ বদলেছে, তবে ফিকে হয়ে আসা স্বপ্ন আর বদলায়নি। বারবার গ্রুপ পর্বেই থেমে যেতে হয়েছে। সেই না পারা, সেই অপূর্ণতার অভিশাপ, সেই জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস, সবকিছুর অবসান হলো অবশেষে।

শেষ বাঁশির পর অনেকের চোখেই জল। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন। কেউ ঘাসে মুখ লুকিয়েছেন। আর শরীর বেয়ে ঘামের বিন্দু ঘাস ছুঁয়ে তৈরি করেছে একটা জাতির জয়গান।

এই রূপকথার পেছনে আরেকজন নীরব কারিগরও আছেন। আর্জেন্টাইন কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে। একটু পাগলাটে, একটু বেশিই আবেগী। নইলে কি ম্যাচ শেষে পাগলের মতো ছুটতে থাকেন? প্রতিটা খেলোয়াড়কে বুকের ছাতায় ধরে রাখেন, চুমু এঁকে দেন একেকজনের কপালে, গালে?

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি এই দলটাকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। তরুণদের ওপর আস্থা রেখেছেন। ভয়হীন ফুটবল খেলতে হবে, এই তত্ত্ব ঢুকিয়েছেন প্রতিটা খেলোয়াড়ের ভেতর। তাদের বোঝাতে পেরেছেন, দেশের জার্সির ওজনটা তৈরি হয় অসীম সাহস দিয়ে।

ওই তত্ত্ব বলেই তো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দিল পুচকে ইকুয়েডর। ঘোষণা করল, স্বপ্নের কোনো সীমা নেই, স্বপ্ন দেখতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। অবশ্য সেসব স্বপ্নের নাম আছে। কোনটা ইকুয়েডর, কোনটা গঞ্জালো প্লাতা, কোনটা আবার সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে।

 

লেখক পরিচিতি

স্টাফ রিপোর্টার

Share via
Copy link