ব্যর্থতা, আশা আর এক অনন্ত প্রতীক্ষা

এবার কি শেষমেশ ভাঙবে ট্রফি খরা? এশিয়া কাপের ইতিহাস সাক্ষী—এই টুর্নামেন্ট বাংলাদেশের কাছে কেবল ক্রিকেট নয়, এ এক অনন্ত প্রতীক্ষার গল্প। প্রতীক্ষার সেই অবসান এবার হবে কি?

সময়ের ক্যালেন্ডারে বদলে গেছে বহু বছর। এসেছে নতুন প্রজন্ম, পাল্টেছে ক্রিকেটের ভাষা। তবু এশিয়া কাপ মানেই বাংলাদেশের জন্য এক অদ্ভুত টান। ট্রফি কখনও ছোঁয়া হয়নি, তবু প্রতিবার নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠে। যেন এই টুর্নামেন্টটাই বাংলাদেশের ক্রিকেট-স্বপ্নের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আয়না—যেখানে প্রতিফলিত হয় ব্যর্থতা, আবার দেখা মেলে সম্ভাবনারও।

এশিয়া কাপ—১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে এখনও পর্যন্ত হয়েছে ১৬ আসর। অংশ নিয়েছে আটটি দেশ, শিরোপা জিতেছে মাত্র তিনটি দল, আর প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দেশ হল শ্রীলঙ্কা।

বাংলাদেশ? তারা খেলেছে ১৫টি আসরে, ভারত-পাকিস্তানের সমান। কিন্তু শিরোপার স্বাদ এখনও অধরাই। তিনবার উঠেছে ফাইনালে, প্রতিবারই শেষ মুহূর্তে হতাশা ছাড়া আর কিছু জোটেনি। ইতিহাসের পরিসংখ্যানে তাই বাংলাদেশ না সবচেয়ে ধারাবাহিক, না সবচেয়ে সফল। তবু বলা যায়, এশিয়া কাপের সঙ্গে সবচেয়ে গভীর যোগ যদি কারও থাকে, তবে সেটা বাংলাদেশেরই।

শুরুটা ১৯৮৬ সালে। এশিয়া কাপের দ্বিতীয় আসরে প্রথমবারের মতো মাঠে নামে বাংলাদেশ। আসরটা হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়, মাত্র তিনটি দল নিয়ে। ভারত তখন অংশ নেয়নি। গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ। পরাজিত হয়েছিল সাত উইকেটে। একই ব্যবধানে হেরেছিল লঙ্কানদের কাছেও।

তখনও বাংলাদেশ ওয়ানডে মর্যাদা পায়নি। ফলে সেসব ম্যাচ আন্তর্জাতিক খেলার মর্যাদা পায়নি সেসময়। তবে ১৯৯৭ সালে ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়ার পর, ম্যাচগুলোকে অফিসিয়াল ওয়ানডে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাকিস্তানের বিপক্ষেই তাই লিপুর দল বাংলাদেশ নাম নিয়ে প্রথমবারের মত প্রায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ।

১৯৮৮ সালে আবার এশিয়া কাপ। এ বার আয়োজনের দায়িত্ব পেল বাংলাদেশ। ঢাকায়, চট্টগ্রামে বসেছিল আসর। ফিরে এসেছিল ভারতও। চার দলের টুর্নামেন্টে লিপুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারও হেরেছিল সবকটি ম্যাচ। কিন্তু মাঠের বাইরের সাফল্য ছিল অন্য রকম।

এটাই ছিল প্রথমবার বাংলাদেশের আয়োজক হওয়া কোনো বড় বহুজাতিক ক্রিকেট আসর। সাফল্যের সঙ্গে সে আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল। আর সেখান থেকেই তৈরি হলো মঞ্চ—১৯৯৮ সালের আইসিসি নকআউট টুর্নামেন্ট আয়োজনের। যে আয়োজন দুই বছরের মাথায় এনে দেয় টেস্ট মর্যাদা।

১৯৯০ থেকে ২০১০—এই দুই দশকে বাংলাদেশের গল্প কেবল পরাজয়ের। সাত আসরে ২৪ ম্যাচ খেলে জয় মাত্র দুইটিতে। কখনও গ্রুপ পর্ব পেরোনো হয়নি। কিন্তু, ২০১২ সালে হঠাৎই পাল্টে গেল দৃশ্যপট। ঘরের মাঠে এশিয়া কাপে ভারত-শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের শেষ বলে, জেতার জন্য চাই ছিল চার রান। পেল মাত্র এক। দুই রানের সেই পরাজয় এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতি।

এরপর ২০১৬—প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ হলো টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। আবারও ঘরের মাঠে, আবারও ফাইনালে বাংলাদেশ। কিন্তু, এবার হারল ভারতের কাছে। ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফাইনালে ওঠার কৃতিত্বও দেখাল বাংলাদেশ। কিন্তু আবারও ভারতই ভাঙল স্বপ্ন। ২০১৪ থেকে ২০১৮ – এই সময়টাকে বাংলাদেশ কার্যত এশিয়ার দ্বিতীয় সেরা দলই ছিল।

তিনবার এশিয়া কাপের রানার আপ—এটাই আজও বাংলাদেশের বড় কোনো টুর্নামেন্টে সেরা সাফল্য। অথচ ওই তিনবারের মধ্যে অন্তত একবার ট্রফি জিততে পারলে, হয়ত বাংলাদেশ ক্রিকেটের মানচিত্রটাই অন্য রকম হতো।

যদিও, সাম্প্রতিক গল্পটা ব্যর্থতা দিয়ে ঠাঁসা।  ২০২২-এ গ্রুপ পর্বেই বিদায়, ২০২৩-এ সুপার ফোর পর্যন্ত গিয়েও আর এগোনো হয়নি। তবে, হারানো গিয়েছিল ভারতকে। এবারের এশিয়া কাপ ফিরছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ফরম্যাট টি-টোয়েন্টি। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ গ্রুপে শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও হংকং। এখান থেকে মাত্র দুটি দল যাবে সুপার ফোরে।

লিটন দাসের নেতৃত্বে শুরু হবে বাংলাদেশের ১৬ তম অভিযান। এবার কি শেষমেশ ভাঙবে ট্রফি খরা? এশিয়া কাপের ইতিহাস সাক্ষী—এই টুর্নামেন্ট বাংলাদেশের কাছে কেবল ক্রিকেট নয়, এ এক অনন্ত প্রতীক্ষার গল্প। প্রতীক্ষার সেই অবসান এবার হবে কি?

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link