পাকিস্তান ক্রিকেট থেকে বলিউড মুভি

সত্তরের দশকের শেষভাগ। করাচির তপ্ত রোদে যখন ব্যাটসম্যানরা লড়ছেন গতির দানবদের বিরুদ্ধে, তখন এক যুবকের ব্যাটে দেখা গেল ভিন্ন ব্যঞ্জনা। তিনি মোহসিন হাসান খান। যার ব্যাটিং ছিল অনেকটা ধ্রুপদী কবিতার মতো। যাতে ছন্দ আছে, আছে ব্যাকরণসিদ্ধ আভিজাত্য, কিন্তু নেই কোনো বাড়তি আস্ফালন।

সত্তরের দশকের শেষভাগ। করাচির তপ্ত রোদে যখন ব্যাটসম্যানরা লড়ছেন গতির দানবদের বিরুদ্ধে, তখন এক যুবকের ব্যাটে দেখা গেল ভিন্ন ব্যঞ্জনা। তিনি মোহসিন হাসান খান। যার ব্যাটিং ছিল অনেকটা ধ্রুপদী কবিতার মতো। যাতে ছন্দ আছে, আছে ব্যাকরণসিদ্ধ আভিজাত্য, কিন্তু নেই কোনো বাড়তি আস্ফালন।

মোহসিন খান যখন ক্রিজে আসতেন, মাঠের চারপাশ যেন একটু বেশিই শান্ত হয়ে যেত। তার ওপেনিং পার্টনাররা যখন বোলারদের ওপর চড়াও হতেন, মোহসিন তখন ব্যস্ত থাকতেন শৈল্পিক ড্রাইভ আর কাট শটে। ১৯৮২ সালে লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে তার ২০০ রানের ইনিংসটি ছিল পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম লেখানো প্রথম পাকিস্তানি ওপেনার হিসেবে তিনি সেদিন যেন ক্রিকেট বিশ্বের দরবারে নিজের রাজকীয় পরিচয় জানান দিয়েছিলেন।।

​অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের বাউন্সি উইকেটেও মোহসিনের ব্যাকফুট পাঞ্চ ছিল দেখার মতো। পেস বোলারদের জন্য তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান ধাঁধা। গতি কিংবা সুইং, সবকিছুই যেন দক্ষ হাতে সাবলীলভাবে সামাল দিতে জানতেন তিনি।

ক্রিকেট মাঠে মোহসিনের সাফল্য যখন তুঙ্গে, তখনই তার জীবনে প্রবেশ করে গ্ল্যামার আর রোমান্সের এক নতুন অধ্যায়। ভারতীয় অভিনেত্রী রীনা রায়ের সাথে তার প্রণয় এবং পরবর্তীতে বিবাহ কেবল দুই দেশের সংবাদপত্রের শিরোনামই হয়নি, বরং মোহসিনকে টেনে নিয়ে যায় বলিউডের আলোঝলমলে দুনিয়ায়।

​ব্যাট তুলে রেখে তিনি হাতে নিলেন চিত্রনাট্য। ‘বাটোয়ারা’ বা ‘সাথি’র মতো চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। তবে সেলুলয়েডের এই জগত তাকে যতোটা হাতছানি দিয়েছিল, ক্রিকেটের প্রতি টান তার চেয়ে কম ছিল না। মাঠের সেই চিরচেনা সবুজ ঘাসের গন্ধ তাকে আবারও ফিরিয়ে আনে ক্রিকেটের আঙিনায়।

​জীবন সবসময় একরৈখিক হয় না। রীনা রায়ের সাথে বিচ্ছেদ হলে পর্দার মায়া কাটিয়ে মোহসিন ফিরে আসেন নিজের শিকড় পাকিস্তানে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি আবির্ভূত হন একজন দক্ষ নির্বাচক এবং কোচ হিসেবে। তার অধীনে পাকিস্তান দল বড় বড় সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেটে মোহসিন রয়ে গেছেন সেই চিরকালীন স্টাইলিশ ব্যাটার হিসেবেই।

জীবন আসলে একটি দীর্ঘ স্পেল, যেখানে মোহসিন খান কোনো উইকেট হারাননি, হারিয়েছেন কেবল নিজেকে। আর রেখে গেছেন এক মখমলি দীর্ঘশ্বাস, যা করাচির সমুদ্র থেকে লর্ডসের ব্যালকনি পর্যন্ত আজও বয়ে বেড়ায়।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link