সবুজ ঘাসের গালিচায় যখন বল হাতে নিয়ে তিনি দৌড় শুরু করতেন, হারারে বা বুলাওয়ের গ্যালারিতে তখন অদ্ভূত এক নিস্তব্ধতা নেমে আসত। সেই নিস্তব্ধতা ভয়ের নয়, বরং এক গভীর আস্থার। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের ইতিহাসে হিথ স্ট্রিক ছিলেন সেই মহীরুহ, যার ছায়ায় এক সময় ডালপালা মেলেছিল ফ্লাওয়ার ভাইরা কিংবা অ্যালিস্টেয়ার ক্যাম্পবেলদের স্বপ্ন।
১৯৭৪ সালে বুলাওয়েতে জন্ম নেওয়া এই দীর্ঘদেহী অলরাউন্ডার ক্রিকেটে এসেছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। বাবা ডেনিস স্ট্রিকও ছিলেন ক্রিকেটার। কিন্তু হিথ নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। তার বোলিংয়ে ছিল না শোয়েব আখতারের মতো গতির ঝড়, কিন্তু ছিল শল্যচিকিৎসকের মতো নিখুঁত লাইন লেন্থ আর অদম্য মানসিকতা। তার ইনসুইঙ্গারগুলো যখন ব্যাটারদের স্টাম্প উপড়ে দিত, তখন মনে হতো জিম্বাবুয়ের রুক্ষ মাটিতে কোনো এক শিল্পী তাঁর তুলি দিয়ে ছবি আঁকছেন।
ব্যাট হাতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত কার্যকরী। বিপদের দিনে তার চওড়া ব্যাট বহুবার খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে দলকে। সাদা পোশাকে ১০০ উইকেট এবং ১০০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়া প্রথম জিম্বাবুইয়ান হিসেবে তিনি নিজেকে অমর করে রেখেছেন।

১৯৯৩ থেকে ২০০৫। এই সময়টা জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের জন্য ছিল এক দীর্ঘ বিদ্যুৎহীন অন্ধকার রাত। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বর্ণবাদের উত্তাপে যখন ড্রেসিংরুমের এসি বিকল হয়ে যেত, তখন হিথ স্ট্রিক ছিলেন একমাত্র ‘ব্যাকআপ জেনারেটর’।
ব্যাট হাতে যখন তিনি সাত নম্বরে নামতেন, তখন কোনো ধ্রুপদী কভার ড্রাইভ নয়, বরং একরোখা মেহনতি মানুষের মতো পেশি শক্ত করে বল সীমানার বাইরে পাঠাতেন। তিনি জানতেন, তার দল কোনো বিলাসিতা করতে পারে না। তার অলরাউন্ডার পারফরম্যান্স ছিল সেই লাইফ সাপোর্ট, যার ওপর ভর করে জিম্বাবুয়ে অন্তত মাথা উঁচু করে লড়তে পারত।
দুই ফরম্যাট মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোটে ৪৫৫ বার প্রতিপক্ষ ব্যাটারকে সাজঘরের পথ দেখিয়েছেন। ব্যাট হাতে সংগ্রহকৃত রানও প্রায় পাঁচ সহস্র ছুঁই ছুঁই।

গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কদের মতো হিথ স্ট্রিকের জীবনেও এক বিশাল পতন এসেছিল। ২০২১ সালে আইসিসি তাকে আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। দুর্নীতির অভিযোগে তার এই পতন ভক্তদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল। যে মানুষটি নিজের রক্ত ঘাম দিয়ে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট গড়েছিলেন, তার নামের পাশে এমন কলঙ্ক ছিল অভাবনীয়। তিনি দায় স্বীকার করেছিলেন, অনুতপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ক্রিকেটের সেই সোনালী ভাবমূর্তিটি ততক্ষণে ম্লান হয়ে যায়।
জীবনের শেষ কয়েকটা বছর হিথ লড়েছেন মরণব্যাধি কোলন ক্যান্সারের সাথে। যে সিংহ মাঠে কখনো পিছু হটেনি, সে নিভৃতে লড়াই চালিয়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক হাসপাতালে। ২০২৩ সালের তিন সেপ্টেম্বর প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। যে হাতগুলো একসময় ডোনাল্ড বা শচীনকে পরাস্ত করত, সেই হাতগুলো চিরতরে স্থির হয়ে গেল। মাতাবেলেল্যান্ডের লাল ধুলোয় মিশে গেলেন সেই মানুষটি, যিনি জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে অনাথ থেকে পরিণত করেছিলেন এক লড়াকু রাজপুত্রে।










